যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় দুই জলাধার লেক পাওয়েল ও লেক মিডে পানির স্তর নেমে গেছে নজিরবিহীনভাবে। এর ফলে কোটি মানুষের পানীয় জল, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
রেকর্ড সর্বনিম্ন পানির স্তর
কলোরাডো নদীর ওপর অবস্থিত লেক পাওয়েল ও লেক মিড পুরো অঞ্চলের পানির অন্যতম প্রধান ভরসা। চলতি আগস্টে লেক পাওয়েলের পানির স্তর রেকর্ড সর্বনিম্নে নেমেছে। এর এক সপ্তাহ আগেই লেক মিডেও রেকর্ড সর্বনিম্ন পানি পরিলক্ষিত হয়।
দুই জলাধারে সম্মিলিতভাবে বর্তমানে যতটুকু পানি রয়েছে, ১৯৫৭ সালের পর আর কখনো এত কম পানি ছিল না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই সময় লেক পাওয়েলই তৈরি হয়নি।
গত তিন দশকের দীর্ঘ খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে গত প্রায় ১ হাজার ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ শুষ্ক সময়ের অন্যতম এটি।
৪ কোটি মানুষের পানির উৎস

কলোরাডো নদী যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ৪ কোটি মানুষ এবং প্রায় ৫৫ লাখ একর কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করে। নদীর পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই ডজন আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং মেক্সিকোর দুটি অঙ্গরাজ্যেরও অধিকার রয়েছে।
অ্যারিজোনা, নেভাদা ও ক্যালিফোর্নিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে লেক পাওয়েল ও লেক মিড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদীর উজানের অংশে মৌসুমি নদী ও প্রবাহের ওপর বেশি নির্ভরতা থাকলেও ভাটির জনবহুল এলাকাগুলোর জন্য এই দুটি জলাধার দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য পানির ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করেছে।
কৃষিতেই সবচেয়ে বেশি পানি খরচ
কলোরাডো নদীর পানির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী কৃষি খাত। গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত আলফালফাসহ বিভিন্ন পশুখাদ্য উৎপাদনেই প্রায় অর্ধেক পানি ব্যয় হয়। পৌর ও নগর ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয় মোট পানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এর বাইরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে নদীর প্রায় ১০ শতাংশ পানিই মানুষের ব্যবহার বা কৃষিকাজে না গিয়ে বাষ্প হয়ে হারিয়ে যায়।
নদীর প্রবাহ কমেছে ২০ শতাংশ
দীর্ঘদিনের উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত দুই দশকে কলোরাডো নদীর পানিপ্রবাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। অথচ নদীর পানির ওপর যে পুরোনো নিয়মে অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ বাস্তবে নদীর বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।
একটি গড় বছরে কলোরাডো নদী দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ একর-ফুট পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু শত বছরের পুরোনো ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ একর-ফুটেরও বেশি।
ফলে পানির সরবরাহ কমলেও ব্যবহার কমেনি। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে দুই জলাধারের পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে।
বর্তমানে লেক মিডে ধারণক্ষমতার মাত্র প্রায় ২৭ শতাংশ পানি রয়েছে। লেক পাওয়েলে রয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বিদ্যুৎ উৎপাদনও হুমকির মুখে
দুই জলাধারেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। লেক মিডে হুভার বাঁধ এবং লেক পাওয়েলে গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
লেক পাওয়েলের পানির স্তর এমন এক পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ দিয়ে আর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শরৎ ও শীতকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে আগামী শীতেই সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে জলাধারটি।
এই দুই বাঁধের বিদ্যুতের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। পানির স্তর কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গেছে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হলে লেক পাওয়েল এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যখন বাঁধের ভেতর দিয়ে পানি প্রবাহিত করাই সম্ভব হবে না। তখন নিচের দিকের অঙ্গরাজ্যগুলোর পানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জরুরি পদক্ষেপ নিয়েও মিলছে না স্থায়ী সমাধান
সংকট সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। ওয়াইওমিং ও কলোরাডোর সীমান্তবর্তী ফ্লেমিং গর্জ জলাধার থেকে পানি সরিয়ে লেক পাওয়েলে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে লেক পাওয়েল থেকে লেক মিডের দিকে পানির প্রবাহও সীমিত করা হয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহর খরা মোকাবিলার পরিকল্পনা কার্যকর করেছে এবং পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ফিনিক্সের মতো বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা অনেক বেড়ে গেলেও মোট পানি ব্যবহারের পরিমাণ অতীতের তুলনায় খুব বেশি বাড়েনি।

তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো অধরা। কলোরাডো নদীর অববাহিকার সাত অঙ্গরাজ্য এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আগামী দশকের জন্য পানি ব্যবহারের নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আলোচনায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
নতুন একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনায় লেক পাওয়েল ও লেক মিডের ওপর নির্ভরশীল অঙ্গরাজ্যগুলোর পানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অ্যারিজোনা এরই মধ্যে ওই প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে, এমন কাটছাঁট অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সামনে আরও কঠিন সময়
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু জরুরি ভিত্তিতে পানি সরিয়ে বা সাময়িক ব্যবহার কমিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনসংখ্যা বাড়ছে, কৃষিকাজ সম্প্রসারিত হচ্ছে, একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও তথ্যকেন্দ্রের মতো পানিনির্ভর শিল্পও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে শীতের তুষারপাত কমে যাওয়া এবং বসন্তের অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে নদীতে বরফগলা পানির প্রবাহও কমছে। শুষ্ক গ্রীষ্মে কলোরাডো নদীর পানির বড় অংশ আসে এই তুষারগলা পানি থেকে।
অর্থাৎ সংকটটি শুধু একটি জলাধারের পানি কমে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি এমন একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন, যেখানে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া পানির পরিমাণ ক্রমেই কমছে।
জলাধার দুটির পানি আরও কমতে থাকলে পানীয় জল থেকে কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্প—দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















