০৫:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
 বিদেশি শ্রমনীতি: সস্তা শ্রম নয়, রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রাই এখন লক্ষ্য জিজিগার করব্যবস্থার সংকট: রাজস্ব আদায়, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ও ডিজিটাল সংস্কারের নতুন পরীক্ষা চা পানে দীর্ঘায়ু থেকে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে মিলতে পারে ৫ উপকার ইরান যুদ্ধের মূল্য এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্থক নয় এশীয় ব্যবসায়ীদের চাপে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে শিল্পভাড়া দ্বিগুণ ঋণের বোঝা থাকলে প্রেমেও ‘না’ বলছেন মিলেনিয়াল ও জেন-জি ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে মার্কিন ঋণ, বাড়ছে অর্থনীতির আর্থিক ঝুঁকি কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ডে  নিহতদের মধ্যে সাতক্ষীরার দুজন রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত: সেনাপ্রধান ইবনে খালদুনের উত্তরাধিকার: ইতিহাসের আলোয় এক অসামান্য চিন্তাবিদ ও তাঁর সীমাবদ্ধতা

 বিদেশি শ্রমনীতি: সস্তা শ্রম নয়, রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রাই এখন লক্ষ্য

উত্তর কোরিয়া বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি এতদিন অনুসরণ করেছে, তাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশটি এখন আর কেবল বেশি সংখ্যক শ্রমিককে বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দিকে নজর দিচ্ছে না। বরং কোন চুক্তি থেকে রাষ্ট্র কতটা লাভ পাবে, সেই হিসাবকে সামনে রেখে বিদেশি শ্রমবাজারকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে পিয়ংইয়ং।

বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন বা ‘ওয়াক্কু’ পুনর্মূল্যায়ন, পুরোনো চুক্তির লাভজনকতা যাচাই এবং কম মুনাফার প্রকল্প বাতিল—সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়া এমন এক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে শ্রমিকের বিদেশযাত্রার সংখ্যার চেয়ে রাষ্ট্রের হাতে শেষ পর্যন্ত কত বৈদেশিক মুদ্রা থাকবে, সেটিই প্রধান বিবেচনা।

এই পরিবর্তনকে শুধু শ্রমিকের মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা যাবে না। এটি উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তর বৈদেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারেরও ইঙ্গিত।

‘ওয়াক্কু’ থাকলেই আর বিদেশে শ্রমিক পাঠানো যাবে না

উত্তর কোরিয়ার কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট দেশে ব্যবসা কিংবা শ্রমিক পাঠাতে চাইলে ‘ওয়াক্কু’ নামে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠান এই অনুমোদন পেলে বিদেশে নিজেদের কার্যক্রম গড়ে তুলে স্থানীয় নিয়োগদাতার সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা ও মজুরি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতে পারত।

এখন সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকের পর বিদ্যমান অনুমোদনগুলো কার্যত পুনর্বিবেচনার আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি বছরের পর বছর বিদেশে শ্রমিক পাঠানো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে কেন্দ্রীয় অনুমোদন নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ পুরোনো সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের ব্যবসা কিংবা আগে অনুমোদন পাওয়া—কোনোটিই ভবিষ্যৎ শ্রমিক পাঠানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নবম দলীয় কংগ্রেসের সময় এই নীতিকে আরও সুস্পষ্ট করা হয়। মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে এমন প্রকল্প বেছে নেওয়া, যেগুলো থেকে রাষ্ট্র বাস্তব ও পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা পাবে।

North Koreans tell BBC they are sent to work 'like slaves' in Russia

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি সরল অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। উত্তর কোরিয়া মনে করছে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানো নিজেই কোনো সাফল্যের মাপকাঠি নয়। শ্রমিক পাঠিয়ে যদি রাষ্ট্রের আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ে, তাহলে সেই চুক্তির অর্থনৈতিক মূল্য খুব সীমিত।

সস্তা শ্রমের বাজার থেকে সরে আসার চেষ্টা

রাশিয়ার মতো দেশে শ্রমিকের ঘাটতি উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং সেই সুযোগকে শুধু শ্রমিক সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে কাজে লাগাতে চাইছে না। বরং শ্রমিকের সরবরাহ সীমিত রেখে চুক্তির মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার ওরেনবুর্গ শহর গত বছর পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য পৌরসেবা খাতে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। সেখানে মাসে ৫৫ হাজার রুবেল, অর্থাৎ প্রায় ৭১৫ ডলারের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়ার সামর্থ্য ছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক নিয়োগের মোট খরচ এর দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে বলে ওই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

এ ঘটনাকে শুধু মজুরি নিয়ে মতবিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতিতে কম লাভের চুক্তি শুরুতেই বাদ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, সাধারণ কৃষিকাজ কিংবা নির্মাণ সহায়তার মতো কাজেও শ্রমিকের প্রয়োজন থাকলেও রাষ্ট্র পর্যাপ্ত আয় না পেলে চুক্তি অনুমোদন না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ পিয়ংইয়ংয়ের হিসাব এখন এমন—বিদেশি নিয়োগদাতার শ্রমিকের প্রয়োজন আছে বলেই উত্তর কোরিয়াকে কম দামে শ্রমিক সরবরাহ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

শ্রমের মূল্য নির্ধারণে নতুন হিসাব

আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে চুক্তি মূল্যায়নের পদ্ধতিতে।

আগে কোনো বিদেশি নিয়োগদাতার সঙ্গে করা চুক্তি, শ্রমিকের সংখ্যা, মজুরি, আবাসন এবং কর্মপরিবেশের মতো বিষয়গুলো প্রধানত বিবেচনা করা হতো। এখন উত্তর কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ পুরো উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার দিকে তাকাতে চাইছে।

কোন কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো কোথা থেকে আসছে, পণ্য কত ধাপে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান মধ্যবর্তী প্রক্রিয়ায় যুক্ত, শেষ পর্যন্ত পণ্য কোন দেশে বা কোন ক্রেতার কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্যও দিতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পণ্যের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য ও মোট মুনাফার হিসাব। উত্তর কোরিয়া জানতে চাইছে, বিদেশি অংশীদার যদি উত্তর কোরিয়ার শ্রম ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা করে, তাহলে সেই শ্রমের বিপরীতে উত্তর কোরিয়া কতটা অর্থ পাচ্ছে।

এখানে একটি মৌলিক পরিবর্তন স্পষ্ট। শ্রমিকের কাজের সময় বা নির্দিষ্ট মাসিক মজুরি দিয়ে শ্রমের মূল্য নির্ধারণের বদলে পণ্যটির চূড়ান্ত বাজারমূল্য এবং সেই পণ্যে শ্রমিকের অবদান কতটা—সেই হিসাবের দিকে ঝুঁকছে রাষ্ট্র।

এটি একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থাও তৈরি করছে। স্থানীয় কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে অর্থের একটি অংশ নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।

কেসংয়ের পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল

এই নীতির কিছু দিক উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ কেসং শিল্পাঞ্চলে মজুরি নিয়ে পুরোনো আলোচনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি ও শ্রমের মূল্য ছিল দীর্ঘদিনের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

North Korean firms tout labor exports and luxury goods despite sanctions |  NK News

সেখানেও উত্তর কোরিয়ার অবস্থানের একটি দিক ছিল—বিদেশি প্রতিষ্ঠান উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের শ্রম ব্যবহার করে যে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে, তার সঙ্গে শ্রমের পারিশ্রমিকের সম্পর্ক থাকা উচিত।

তবে বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে কেসংয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। কেসং পরিচালিত হয়েছিল দুই কোরিয়ার মধ্যে চুক্তি ও নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে। এখন বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ সরাসরি পিয়ংইয়ংয়ের হাতে।

কোন দেশ, কোন শিল্প, কী ধরনের চুক্তি এবং রাষ্ট্রের জন্য কতটা আয়—সবকিছু কেন্দ্র থেকে বিচার করা হচ্ছে। যে চুক্তি নির্ধারিত লাভের মানদণ্ড পূরণ করছে না, তার অনুমোদন আটকে দেওয়া হচ্ছে।

ফলে উত্তর কোরিয়া কার্যত বিদেশে সরবরাহ করা শ্রমের দাম নিজেই নির্ধারণ করতে চাইছে।

চুক্তির মূল্য বাড়লেও শ্রমিকের আয় বাড়বে কি?

এখানেই উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যটি রয়েছে।

বিদেশি শ্রমিকের জন্য চুক্তিমূল্য বাড়লে স্বাভাবিকভাবে ধারণা হতে পারে, শ্রমিকের হাতে পাওয়া অর্থও বাড়বে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বাস্তবতায় এই দুই বিষয় এক নয়।

একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠানোর চুক্তিমূল্যের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কর বা আদায়, প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যয়, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা, আবাসন, খাবার, যাতায়াত, পোশাক ও সরঞ্জামের খরচসহ নানা ধরনের অর্থ কেটে নেওয়া হয়। ফলে বিদেশি নিয়োগদাতা যে অর্থ পরিশোধ করেন, তার একটি সীমিত অংশই শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের হাতে পৌঁছাতে পারে।

চীনের সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে Daily NK ও AND Center-এর এক অনুসন্ধানেও এমন ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে। চুক্তিতে মাসে প্রায় ৩ হাজার চীনা ইউয়ান পাওয়ার কথা থাকলেও কিছু শ্রমিক বাস্তবে তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ পেয়েছেন।

এক শ্রমিক জানিয়েছেন, সাধারণত তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ ইউয়ান পান, কখনও ৮০০ ইউয়ান পর্যন্ত পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রাষ্ট্রের কাছে চলে যায়।

এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে: বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর চুক্তির মূল্য এবং শ্রমিকের ব্যক্তিগত আয়কে এক করে দেখা যায় না।

রাষ্ট্রের মুনাফাই যখন মূল লক্ষ্য

উত্তর কোরিয়ার বর্তমান নীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। রাষ্ট্র শ্রমিকের অধিকার বা ব্যক্তিগত আয়ের সর্বোচ্চীকরণকে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে নিচ্ছে না। বরং বিদেশি শ্রম থেকে রাষ্ট্রের হাতে কতটা নিট বৈদেশিক মুদ্রা থাকবে, সেটিই হয়ে উঠছে প্রধান সূচক।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক পিটার ওয়ার্ডও সতর্ক করেছেন যে কোনো শ্রমিকের চুক্তিমূল্যকে তার ব্যক্তিগত বেতন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কাজের ধরন অনুযায়ী দালালি, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচের কাঠামো বদলে যায়। ছোট দলভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি কাজের ক্ষেত্রেও আয়ের ভাগাভাগি ভিন্ন হতে পারে।

এই কারণে উত্তর কোরিয়া যে চুক্তির মূল্য বাড়াতে চাইছে, তার অর্থ এই নয় যে বিদেশে থাকা শ্রমিকরা সমান হারে বেশি অর্থ পাবেন।

বরং বিপরীতভাবে বলা যায়, পিয়ংইয়ং শ্রমিককে একটি বৃহত্তর বৈদেশিক আয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে, যার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ যত বেশি, বিদেশ থেকে অর্জিত অর্থের কতটা নিজের হাতে রাখা যাবে—সেটিও তত বেশি।

রাশিয়ার শ্রমবাজারে ঝুঁকিও আছে

তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, সেটি নিশ্চিত নয়।

Exclusive: North Korean forced labor behind Chinese seafood sold in South  Korea

উত্তর কোরিয়া যদি শ্রমিকের সরবরাহ কমিয়ে চুক্তিমূল্য বাড়াতে চায়, তাহলে তাকে একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারের বাস্তবতাও বুঝতে হবে। শ্রমের ঘাটতি থাকলেও কোনো নিয়োগদাতা অসীম মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবে না।

ওরেনবুর্গের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উত্তর কোরিয়া যে মূল্য প্রত্যাশা করছে এবং স্থানীয় নিয়োগদাতারা যে মূল্য দিতে সক্ষম বা ইচ্ছুক—তার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে।

গবেষক ওয়ার্ডের মতে, উত্তর কোরিয়া হয়তো এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে চীনসহ পুরোনো শ্রমিক পাঠানোর কর্মসূচিগুলো থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক ফল আসছে না। একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণেও ভুল হিসাব থাকতে পারে।

অর্থাৎ শ্রমের দাম কেন্দ্র থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব হলেও সেই দাম বাজারে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিয়োগদাতার চাহিদা ও বিকল্প শ্রম সরবরাহের ওপর।

স্বনির্ভরতার অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার কথা বলে আসছে। কিন্তু বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নতুন নীতি দেখাচ্ছে, আত্মনির্ভরতার ধারণা দেশটিকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমানোর দিকে সরলভাবে ঠেলে দিচ্ছে না।

বরং পিয়ংইয়ং বিদেশি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর আরও বেশি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বিদেশ থেকে অর্থ আসবে, কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে আসবে, কোন চুক্তির মাধ্যমে আসবে এবং তার কতটা রাষ্ট্রের হাতে থাকবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনকে তাই শুধু বিদেশি শ্রমবাজারের নীতি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক আয়ের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।

The Future of K-Power: What South Korea Must Do After Peaking | Carnegie  Endowment for International Peace

তবে এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—যে শ্রমিকরা এই অর্থ উপার্জন করছেন, তারা নিজেদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে কতটা জানতে পারেন?

শ্রমিকের আয়, রাষ্ট্রের আদায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের অংশের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হতে পারে, সেটি বুঝতে তথ্যের প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকরা কত আয় করছেন, রাষ্ট্র কত নিচ্ছে এবং তাদের শ্রম থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কোথায় তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য যদি তাদের কাছে অপ্রাপ্য থাকে, তাহলে উচ্চ চুক্তিমূল্যও শ্রমিকের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে না।

শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতি একটি বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দেশটি হয়তো কম দামে বিপুল শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো মডেল থেকে সরে এসে সীমিত শ্রম সরবরাহের মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ের চেষ্টা করছে।

কিন্তু শ্রমের দাম বাড়ানো এবং শ্রমিকের জীবনমান বাড়ানো এক বিষয় নয়। পিয়ংইয়ংয়ের নতুন হিসাব রাষ্ট্রের আয় বাড়াতে পারে, কিন্তু শ্রমিক সেই বাড়তি মূল্যের কতটা পাবেন, সেটিই হবে এই নীতির মানবিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু চুক্তির অঙ্ক দেখলে চলবে না। দেখতে হবে অর্থ কোথা থেকে আসে, কার হাতে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের হাতে কতটা পৌঁছায়। উত্তর কোরিয়ার বিদেশি শ্রমনীতি বোঝার জন্য এই অর্থপ্রবাহের হিসাবই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জানালা।

জনপ্রিয় সংবাদ

 বিদেশি শ্রমনীতি: সস্তা শ্রম নয়, রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রাই এখন লক্ষ্য

 বিদেশি শ্রমনীতি: সস্তা শ্রম নয়, রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রাই এখন লক্ষ্য

১০:০০:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

উত্তর কোরিয়া বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি এতদিন অনুসরণ করেছে, তাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশটি এখন আর কেবল বেশি সংখ্যক শ্রমিককে বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দিকে নজর দিচ্ছে না। বরং কোন চুক্তি থেকে রাষ্ট্র কতটা লাভ পাবে, সেই হিসাবকে সামনে রেখে বিদেশি শ্রমবাজারকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে পিয়ংইয়ং।

বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর অনুমোদন বা ‘ওয়াক্কু’ পুনর্মূল্যায়ন, পুরোনো চুক্তির লাভজনকতা যাচাই এবং কম মুনাফার প্রকল্প বাতিল—সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়া এমন এক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে শ্রমিকের বিদেশযাত্রার সংখ্যার চেয়ে রাষ্ট্রের হাতে শেষ পর্যন্ত কত বৈদেশিক মুদ্রা থাকবে, সেটিই প্রধান বিবেচনা।

এই পরিবর্তনকে শুধু শ্রমিকের মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা যাবে না। এটি উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তর বৈদেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারেরও ইঙ্গিত।

‘ওয়াক্কু’ থাকলেই আর বিদেশে শ্রমিক পাঠানো যাবে না

উত্তর কোরিয়ার কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট দেশে ব্যবসা কিংবা শ্রমিক পাঠাতে চাইলে ‘ওয়াক্কু’ নামে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠান এই অনুমোদন পেলে বিদেশে নিজেদের কার্যক্রম গড়ে তুলে স্থানীয় নিয়োগদাতার সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা ও মজুরি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতে পারত।

এখন সেই কাঠামো বদলে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকের পর বিদ্যমান অনুমোদনগুলো কার্যত পুনর্বিবেচনার আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি বছরের পর বছর বিদেশে শ্রমিক পাঠানো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে কেন্দ্রীয় অনুমোদন নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ পুরোনো সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের ব্যবসা কিংবা আগে অনুমোদন পাওয়া—কোনোটিই ভবিষ্যৎ শ্রমিক পাঠানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নবম দলীয় কংগ্রেসের সময় এই নীতিকে আরও সুস্পষ্ট করা হয়। মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে এমন প্রকল্প বেছে নেওয়া, যেগুলো থেকে রাষ্ট্র বাস্তব ও পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা পাবে।

North Koreans tell BBC they are sent to work 'like slaves' in Russia

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি সরল অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। উত্তর কোরিয়া মনে করছে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানো নিজেই কোনো সাফল্যের মাপকাঠি নয়। শ্রমিক পাঠিয়ে যদি রাষ্ট্রের আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ে, তাহলে সেই চুক্তির অর্থনৈতিক মূল্য খুব সীমিত।

সস্তা শ্রমের বাজার থেকে সরে আসার চেষ্টা

রাশিয়ার মতো দেশে শ্রমিকের ঘাটতি উত্তর কোরিয়ার জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং সেই সুযোগকে শুধু শ্রমিক সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে কাজে লাগাতে চাইছে না। বরং শ্রমিকের সরবরাহ সীমিত রেখে চুক্তির মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার ওরেনবুর্গ শহর গত বছর পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য পৌরসেবা খাতে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। সেখানে মাসে ৫৫ হাজার রুবেল, অর্থাৎ প্রায় ৭১৫ ডলারের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক দেওয়ার সামর্থ্য ছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক নিয়োগের মোট খরচ এর দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে বলে ওই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

এ ঘটনাকে শুধু মজুরি নিয়ে মতবিরোধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতিতে কম লাভের চুক্তি শুরুতেই বাদ দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, সাধারণ কৃষিকাজ কিংবা নির্মাণ সহায়তার মতো কাজেও শ্রমিকের প্রয়োজন থাকলেও রাষ্ট্র পর্যাপ্ত আয় না পেলে চুক্তি অনুমোদন না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ পিয়ংইয়ংয়ের হিসাব এখন এমন—বিদেশি নিয়োগদাতার শ্রমিকের প্রয়োজন আছে বলেই উত্তর কোরিয়াকে কম দামে শ্রমিক সরবরাহ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

শ্রমের মূল্য নির্ধারণে নতুন হিসাব

আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে চুক্তি মূল্যায়নের পদ্ধতিতে।

আগে কোনো বিদেশি নিয়োগদাতার সঙ্গে করা চুক্তি, শ্রমিকের সংখ্যা, মজুরি, আবাসন এবং কর্মপরিবেশের মতো বিষয়গুলো প্রধানত বিবেচনা করা হতো। এখন উত্তর কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ পুরো উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার দিকে তাকাতে চাইছে।

কোন কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো কোথা থেকে আসছে, পণ্য কত ধাপে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান মধ্যবর্তী প্রক্রিয়ায় যুক্ত, শেষ পর্যন্ত পণ্য কোন দেশে বা কোন ক্রেতার কাছে যাচ্ছে—এসব তথ্যও দিতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পণ্যের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য ও মোট মুনাফার হিসাব। উত্তর কোরিয়া জানতে চাইছে, বিদেশি অংশীদার যদি উত্তর কোরিয়ার শ্রম ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা করে, তাহলে সেই শ্রমের বিপরীতে উত্তর কোরিয়া কতটা অর্থ পাচ্ছে।

এখানে একটি মৌলিক পরিবর্তন স্পষ্ট। শ্রমিকের কাজের সময় বা নির্দিষ্ট মাসিক মজুরি দিয়ে শ্রমের মূল্য নির্ধারণের বদলে পণ্যটির চূড়ান্ত বাজারমূল্য এবং সেই পণ্যে শ্রমিকের অবদান কতটা—সেই হিসাবের দিকে ঝুঁকছে রাষ্ট্র।

এটি একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থাও তৈরি করছে। স্থানীয় কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তির প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে অর্থের একটি অংশ নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।

কেসংয়ের পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল

এই নীতির কিছু দিক উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ কেসং শিল্পাঞ্চলে মজুরি নিয়ে পুরোনো আলোচনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি ও শ্রমের মূল্য ছিল দীর্ঘদিনের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

North Korean firms tout labor exports and luxury goods despite sanctions |  NK News

সেখানেও উত্তর কোরিয়ার অবস্থানের একটি দিক ছিল—বিদেশি প্রতিষ্ঠান উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের শ্রম ব্যবহার করে যে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে, তার সঙ্গে শ্রমের পারিশ্রমিকের সম্পর্ক থাকা উচিত।

তবে বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে কেসংয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। কেসং পরিচালিত হয়েছিল দুই কোরিয়ার মধ্যে চুক্তি ও নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে। এখন বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ সরাসরি পিয়ংইয়ংয়ের হাতে।

কোন দেশ, কোন শিল্প, কী ধরনের চুক্তি এবং রাষ্ট্রের জন্য কতটা আয়—সবকিছু কেন্দ্র থেকে বিচার করা হচ্ছে। যে চুক্তি নির্ধারিত লাভের মানদণ্ড পূরণ করছে না, তার অনুমোদন আটকে দেওয়া হচ্ছে।

ফলে উত্তর কোরিয়া কার্যত বিদেশে সরবরাহ করা শ্রমের দাম নিজেই নির্ধারণ করতে চাইছে।

চুক্তির মূল্য বাড়লেও শ্রমিকের আয় বাড়বে কি?

এখানেই উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যটি রয়েছে।

বিদেশি শ্রমিকের জন্য চুক্তিমূল্য বাড়লে স্বাভাবিকভাবে ধারণা হতে পারে, শ্রমিকের হাতে পাওয়া অর্থও বাড়বে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বাস্তবতায় এই দুই বিষয় এক নয়।

একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠানোর চুক্তিমূল্যের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কর বা আদায়, প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যয়, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা, আবাসন, খাবার, যাতায়াত, পোশাক ও সরঞ্জামের খরচসহ নানা ধরনের অর্থ কেটে নেওয়া হয়। ফলে বিদেশি নিয়োগদাতা যে অর্থ পরিশোধ করেন, তার একটি সীমিত অংশই শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের হাতে পৌঁছাতে পারে।

চীনের সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়ে Daily NK ও AND Center-এর এক অনুসন্ধানেও এমন ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে। চুক্তিতে মাসে প্রায় ৩ হাজার চীনা ইউয়ান পাওয়ার কথা থাকলেও কিছু শ্রমিক বাস্তবে তার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ পেয়েছেন।

এক শ্রমিক জানিয়েছেন, সাধারণত তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ ইউয়ান পান, কখনও ৮০০ ইউয়ান পর্যন্ত পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রাষ্ট্রের কাছে চলে যায়।

এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে: বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর চুক্তির মূল্য এবং শ্রমিকের ব্যক্তিগত আয়কে এক করে দেখা যায় না।

রাষ্ট্রের মুনাফাই যখন মূল লক্ষ্য

উত্তর কোরিয়ার বর্তমান নীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। রাষ্ট্র শ্রমিকের অধিকার বা ব্যক্তিগত আয়ের সর্বোচ্চীকরণকে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে নিচ্ছে না। বরং বিদেশি শ্রম থেকে রাষ্ট্রের হাতে কতটা নিট বৈদেশিক মুদ্রা থাকবে, সেটিই হয়ে উঠছে প্রধান সূচক।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক পিটার ওয়ার্ডও সতর্ক করেছেন যে কোনো শ্রমিকের চুক্তিমূল্যকে তার ব্যক্তিগত বেতন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কাজের ধরন অনুযায়ী দালালি, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচের কাঠামো বদলে যায়। ছোট দলভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি কাজের ক্ষেত্রেও আয়ের ভাগাভাগি ভিন্ন হতে পারে।

এই কারণে উত্তর কোরিয়া যে চুক্তির মূল্য বাড়াতে চাইছে, তার অর্থ এই নয় যে বিদেশে থাকা শ্রমিকরা সমান হারে বেশি অর্থ পাবেন।

বরং বিপরীতভাবে বলা যায়, পিয়ংইয়ং শ্রমিককে একটি বৃহত্তর বৈদেশিক আয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে, যার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ যত বেশি, বিদেশ থেকে অর্জিত অর্থের কতটা নিজের হাতে রাখা যাবে—সেটিও তত বেশি।

রাশিয়ার শ্রমবাজারে ঝুঁকিও আছে

তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, সেটি নিশ্চিত নয়।

Exclusive: North Korean forced labor behind Chinese seafood sold in South  Korea

উত্তর কোরিয়া যদি শ্রমিকের সরবরাহ কমিয়ে চুক্তিমূল্য বাড়াতে চায়, তাহলে তাকে একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারের বাস্তবতাও বুঝতে হবে। শ্রমের ঘাটতি থাকলেও কোনো নিয়োগদাতা অসীম মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবে না।

ওরেনবুর্গের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উত্তর কোরিয়া যে মূল্য প্রত্যাশা করছে এবং স্থানীয় নিয়োগদাতারা যে মূল্য দিতে সক্ষম বা ইচ্ছুক—তার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে।

গবেষক ওয়ার্ডের মতে, উত্তর কোরিয়া হয়তো এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে চীনসহ পুরোনো শ্রমিক পাঠানোর কর্মসূচিগুলো থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক ফল আসছে না। একই সঙ্গে বিদেশি শ্রমবাজারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণেও ভুল হিসাব থাকতে পারে।

অর্থাৎ শ্রমের দাম কেন্দ্র থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব হলেও সেই দাম বাজারে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিয়োগদাতার চাহিদা ও বিকল্প শ্রম সরবরাহের ওপর।

স্বনির্ভরতার অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার কথা বলে আসছে। কিন্তু বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নতুন নীতি দেখাচ্ছে, আত্মনির্ভরতার ধারণা দেশটিকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমানোর দিকে সরলভাবে ঠেলে দিচ্ছে না।

বরং পিয়ংইয়ং বিদেশি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর আরও বেশি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বিদেশ থেকে অর্থ আসবে, কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে আসবে, কোন চুক্তির মাধ্যমে আসবে এবং তার কতটা রাষ্ট্রের হাতে থাকবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনকে তাই শুধু বিদেশি শ্রমবাজারের নীতি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক আয়ের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।

The Future of K-Power: What South Korea Must Do After Peaking | Carnegie  Endowment for International Peace

তবে এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—যে শ্রমিকরা এই অর্থ উপার্জন করছেন, তারা নিজেদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে কতটা জানতে পারেন?

শ্রমিকের আয়, রাষ্ট্রের আদায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের অংশের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হতে পারে, সেটি বুঝতে তথ্যের প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকরা কত আয় করছেন, রাষ্ট্র কত নিচ্ছে এবং তাদের শ্রম থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কোথায় তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্য যদি তাদের কাছে অপ্রাপ্য থাকে, তাহলে উচ্চ চুক্তিমূল্যও শ্রমিকের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে না।

শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার নতুন নীতি একটি বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দেশটি হয়তো কম দামে বিপুল শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো মডেল থেকে সরে এসে সীমিত শ্রম সরবরাহের মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ের চেষ্টা করছে।

কিন্তু শ্রমের দাম বাড়ানো এবং শ্রমিকের জীবনমান বাড়ানো এক বিষয় নয়। পিয়ংইয়ংয়ের নতুন হিসাব রাষ্ট্রের আয় বাড়াতে পারে, কিন্তু শ্রমিক সেই বাড়তি মূল্যের কতটা পাবেন, সেটিই হবে এই নীতির মানবিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু চুক্তির অঙ্ক দেখলে চলবে না। দেখতে হবে অর্থ কোথা থেকে আসে, কার হাতে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের হাতে কতটা পৌঁছায়। উত্তর কোরিয়ার বিদেশি শ্রমনীতি বোঝার জন্য এই অর্থপ্রবাহের হিসাবই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জানালা।