শিকাগোর শিল্পী রাভিন লেনাই তাঁর তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ‘ব্লু আইল্যান্ড’ নিয়ে হাজির হয়েছেন এমন এক সময়ে, যখন তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে এবং একই সঙ্গে বেড়েছে তাঁকে নির্দিষ্ট সংগীতধারার মধ্যে আটকে রাখার প্রবণতাও। নতুন অ্যালবামে সেই সীমাবদ্ধতাকেই যেন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। পপ, রক, নৃত্যসংগীত, হিপহপ ও পুরোনো শিকাগো সোল—সবকিছুকে নিজের মতো করে একসঙ্গে মিশিয়েছেন এই শিল্পী।
জনপ্রিয়তার পর ঘরে ফেরা
লেনাইয়ের সংগীতজীবনের শুরু এক দশকেরও বেশি আগে। শিকাগোর শহরতলি থেকে উঠে আসা এই শিল্পী প্রথমে ভূগর্ভস্থ আরঅ্যান্ডবি সংগীতের মাধ্যমে পরিচিতি পান। ২০২২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ‘হিপনস’ সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।
পরের অ্যালবাম ‘বার্ডস আই’ বদলে দেয় সেই পরিস্থিতি। বিশেষ করে ‘লাভ মি নট’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানটির ব্যাপক প্রচার তাঁকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর সাবরিনা কার্পেন্টারের সঙ্গে সফরে অংশ নেওয়ার সুযোগও পান তিনি।
তবে এই সাফল্যের পর বড় বড় জনপ্রিয় সংগীত প্রযোজকের সঙ্গে কাজ করার দিকে ছুটে যাননি লেনাই। বরং নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইলিনয়ের নিজ শহর ব্লু আইল্যান্ডে ফিরে তিনি দীর্ঘদিনের সহযোগী দাহির সঙ্গে নতুন অ্যালবামের কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই অ্যালবামের নাম—‘ব্লু আইল্যান্ড’।
সাফল্যের চাপ থেকে নিজের কাছে ফেরা
নতুন অ্যালবামের পেছনে রয়েছে তাঁর জীবনের বড় ধরনের পরিবর্তন। দীর্ঘ সম্পর্কের সমাপ্তি, হঠাৎ বেড়ে যাওয়া খ্যাতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের নানা মন্তব্য—সবকিছু তাঁকে নিজের পরিচয় ও শিল্পীসত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
লেনাইয়ের কাছে দাহির সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও বোঝাপড়া রয়েছে। দাহির বাড়ির স্টুডিওতেই অ্যালবামের বেশির ভাগ গান তৈরি হয়েছে। সেখানে তাঁর সন্তানদের আনাগোনা, পরিবারের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং পরিচিত মানুষের উপস্থিতি তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে।
তবে সেই স্বস্তি কখনোই আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়নি। বরং দুজনের মধ্যেই ছিল আরও নতুন কিছু করার তাগিদ।
এক অ্যালবামে বহু সংগীতধারা
‘ব্লু আইল্যান্ড’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। ‘হ্যান্ডল’ গানে গিটারনির্ভর পপ-রকের সঙ্গে তীব্র ছন্দ ও আঁকাবাঁকা সুরের ব্যবহার রয়েছে। ‘স্যাটারডে নাইট’ অপেক্ষাকৃত ঝলমলে পপধর্মী গান, যেখানে পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ার পরও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার গল্প উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ‘লেট আস ইন’ গানে রয়েছে নৃত্যনির্ভর উত্তেজনাময় ছন্দ। ‘রেপুটেশন’-এ শোনা যায় অনেক বেশি সরল, কোমল গিটারনির্ভর ইন্ডি-পপের আবহ। ডমিনিক ফাইকের উপস্থিতি গানটিকে আরও আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
‘বেবিগার্ল’ গানে পপ ও হিপহপের সঙ্গে নব্য-ফাঙ্কের মিশেল ঘটিয়েছেন লেনাই। সেখানে ডয়েচির র্যাপও রয়েছে।
আর ‘নেভার লেট মি গো’ গানটি নিয়ে গেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহে। পুরোনো শিকাগো সোল ও ডু-ওপ সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি গানটির শেষদিকে তাঁর দাদা-দাদির সঙ্গে কথোপকথনের একটি আবেগঘন রেকর্ডিং যুক্ত হয়েছে।
কোনো একটি পরিচয়ে আটকে থাকতে চান না
লেনাইয়ের সংগীতের বৈচিত্র্য নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। বিশেষ করে একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে তিনি কেন বিভিন্ন সংগীতধারায় কাজ করছেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে লেনাই মনে করেন, সংগীতের প্রতি নিজের কৌতূহলকে কোনো শ্রেণিবিভাগের কারণে আটকে রাখা উচিত নয়। তাঁর মতে, তিনি কোন তালিকায় জায়গা পাবেন কিংবা কোন ধরনের শ্রোতা তাঁর গান শুনবে—এসব নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করলে সৃষ্টিশীলতার স্বাধীনতা নষ্ট হয়।
তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, রক, পপ কিংবা নৃত্যসংগীতের মতো বহু ধারার শিকড়ও কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের সংগীতচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে এসব ধারায় কাজ করার অধিকার নিয়ে তাঁকে অস্বস্তিতে ভুগতে রাজি নন তিনি।
এই অবস্থানকে তিনি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মালিকানার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সংগীতধারা ঐতিহাসিকভাবে নেওয়া বা তাদের অবদানকে আড়াল করার ঘটনা রয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিজেদের মতো করে সীমানা ভাঙা জরুরি।
শরীরী ভাষাতেও নতুন পরীক্ষা
‘ব্লু আইল্যান্ড’-এর গানগুলোর পাশাপাশি মঞ্চ উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনছেন লেনাই। এই প্রথম তিনি নিয়মিত নৃত্যভঙ্গি ও পরিকল্পিত শরীরী আন্দোলনকে নিজের পরিবেশনার অংশ করছেন।
আকিরা উচিদার সঙ্গে কাজ করে তিনি এমন এক নৃত্যভাষা তৈরি করছেন, যেখানে তীক্ষ্ণতা, অস্বাভাবিকতা ও খানিকটা রহস্যময় আবহ একসঙ্গে থাকবে।
আগে তিনি মনে করতেন, নৃত্যপরিকল্পনা হয়তো তাঁর জন্য নয়। কিন্তু এখন সেই ধারণাকে উল্টে দিয়ে নতুন অভিজ্ঞতাকে উপভোগ করছেন। আসন্ন সফরের জন্য কণ্ঠচর্চার পাশাপাশি শরীরচর্চাও করছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন পরিবেশনা আগের সফরের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা দেবে।
পোশাকেও স্বচ্ছন্দতার খোঁজ
নতুন অ্যালবামের দৃশ্যজগতেও ফ্যাশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে মঞ্চের পোশাক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে লেনাইয়ের প্রথম চিন্তা সৌন্দর্য নয়, ব্যবহারিকতা।
তাঁর ভাষায়, পোশাক যতই আকর্ষণীয় হোক, মঞ্চে নড়াচড়া করতে না পারলে সেটির কোনো অর্থ নেই।
ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি মডেল ডোনিয়েল লুনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মধ্যে লেনাই একসঙ্গে সময়হীন সৌন্দর্য, খানিকটা রহস্যময়তা, রুক্ষতা ও কমনীয়তা দেখতে পান।
‘ব্লু আইল্যান্ড’-এর ক্ষেত্রে তাঁর পোশাকের ভাবনাও তাই অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। সাজসজ্জায় অতিরিক্ত সময় না দিয়ে নিজের শরীরের সঙ্গে স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ সম্পর্ক তৈরি করাই তাঁর কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের নিয়মে শিল্পী হওয়ার ঘোষণা
রাভিন লেনাইয়ের নতুন অ্যালবাম আসলে শুধু বিভিন্ন সংগীতধারার সমন্বয় নয়; এটি তাঁর শিল্পী হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা। তিনি মনে করেন, একটি ভালো গানের আসল শক্তি কোনো নির্দিষ্ট সংগীতধারায় নয়, বরং এমন সুরে যা সময় ও ঘরানার সীমা পেরিয়ে মানুষের মনে থেকে যায়।
‘ব্লু আইল্যান্ড’-এ সেই চেষ্টাই বারবার দেখা যায়। পপের আকর্ষণ, রকের তীব্রতা, নৃত্যসংগীতের ছন্দ, হিপহপের শক্তি আর শিকাগোর সোল—সবকিছুকে নিজের কণ্ঠ ও সুরের মাধ্যমে এক সুতোয় বেঁধেছেন লেনাই।
শেষ পর্যন্ত তাঁর বার্তা খুব সরল—তাঁকে কোনো একটি খোপে রাখা যাবে না। তিনি যে ধরনের শিল্পী হতে চান, সেই শিল্পীই হবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















