ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবহারকারীর সংখ্যা, সম্পৃক্ততা ও মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন মেটার সাবেক প্রকৌশল পরিচালক আর্তুরো বেহার। যুক্তরাষ্ট্রে মেটার বিরুদ্ধে চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বুধবার দ্বিতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি এসব কথা বলেন।
২৯ অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ
মামলাটিতে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সিসহ ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তরুণ ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় এসব প্ল্যাটফর্মে আটকে থাকে। এর ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এমনকি আত্মহত্যার মতো গুরুতর সমস্যাও বাড়তে পারে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আরও অভিযোগ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও ব্যবহারের মাধ্যমে মেটা ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করেছে।
মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে মামলার শুনানি শুরু হয়। বিচারপ্রক্রিয়া প্রায় ছয় সপ্তাহ চলতে পারে। জুরি একটি পরামর্শমূলক রায় দেবে। এরপর বিচারক ঠিক করবেন মেটা দায়ী কি না এবং দায়ী হলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কী ধরনের আর্থিক জরিমানা বা প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হবে।
‘জাকারবার্গ চাইলে দ্রুত সব বদলে যায়’
মেটায় ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কাজ করা বেহার বলেন, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তার দাবি, মেটার ওপর থেকে নিচে নির্দেশনির্ভর সংস্কৃতির কারণে জাকারবার্গের নির্দেশ ছাড়া পণ্য বা সেবার নকশায় বড় পরিবর্তন আনা কঠিন ছিল।
বেহারের ভাষ্য, জাকারবার্গ কোনো বিষয়কে অগ্রাধিকার দিলে কয়েক মাসের মধ্যেই বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব হতো।
২০২১ সালে মেটার সাবেক কর্মী ফ্রান্সেস হাউগেনের অভিযোগের পর জাকারবার্গ বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত গবেষণা ব্যবহার করে তাদের পণ্য উন্নত করে। তবে বেহার আদালতে দাবি করেন, তিনি তখন জাকারবার্গকে সরাসরি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন।
বেহার বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে জাকারবার্গকে বিশ্বাস করা যায় না।
মেয়ের বিরূপ অভিজ্ঞতার কথাও আদালতে
বেহার জানান, তার কিশোরী মেয়েও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছিল। নারীরা গাড়ি নিয়ে আলোচনা করতে পারে—এমন একটি জায়গা তৈরির উদ্দেশ্যে তার মেয়ে প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার শুরু করেছিল।
কিন্তু পরে সেখানে তার শরীর নিয়ে অশালীন ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করা হয়। ২০২১ সালে মেয়েটির বয়স ছিল ১৬ বছর। সেই সময় বেহার নিরাপত্তা নিয়ে জাকারবার্গকে ই-মেইল করেছিলেন।
তিনি বলেন, মেয়েটি প্ল্যাটফর্মে ভালোসংখ্যক অনুসারী পেলেও এর বিনিময়ে তাকে ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তবে জেরার সময় মেটার আইনজীবী ব্রায়ান স্টেকলফের প্রশ্নের জবাবে বেহার স্বীকার করেন, মেটায় শিশু ও তরুণদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা শত শত কর্মী রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে অনেককেই তিনি দক্ষ বলে মনে করেন। তিনি আরও জানান, মেটায় দ্বিতীয় দফায় কাজ করার সময় তিনি সরাসরি জাকারবার্গের সঙ্গে কাজ করতেন না এবং বাইরের ঠিকাদার হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও সুযোগেরও তার সরাসরি প্রবেশাধিকার ছিল না।
নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফা?
অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবীদের জেরায় বেহার অভিযোগ করেন, মেটা ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা ও মুনাফাকে নিরাপত্তার ওপরে স্থান দিয়েছে।
ব্যবহারকারীদের কিছু সময় বিরতি নিতে উৎসাহিত করার জন্য মেটার যে ব্যবস্থা রয়েছে, সেটিকেও তিনি সমালোচনা করেন। তার দাবি, ব্যবস্থাটি কার্যত ব্যর্থ হওয়ার মতো করেই তৈরি করা হয়েছে, কারণ এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু থাকে না এবং ব্যবহারকারীরা সহজেই এর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করতে পারেন।
বেহারের আরও দাবি, মেটার কাছে ১৩ বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী শনাক্ত করার প্রযুক্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি।
মেটার বিরুদ্ধে আরও হাজারো মামলা
বেহারের সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর আদালতে মেটার এক গবেষক এলেনা ডেভিসের রেকর্ড করা সাক্ষ্য শোনানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা ডেভিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ফেসবুকের এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব, যাতে এর অভ্যাসে পরিণত হওয়ার প্রবণতা কমে এবং ব্যবহারকারীরা চাইলে সহজে তা থেকে বিরতি নিতে পারেন।
শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আরও হাজারো মামলা চলছে। এর মধ্যে চারটি মামলায় বেহার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে মেটার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
নিউ মেক্সিকোর করা একটি মামলায় মেটাকে ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা দিতে এবং অঙ্গরাজ্যটিতে তাদের প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















