বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম চিনিপাড়া গ্রামে হামে আক্রান্ত সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন লেংরুং ম্রো (২৬) নামে এক মা। বান্দরবান সদর হাসপাতালে সন্তানদের চিকিৎসার সময় অসুস্থ হয়ে পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থাভাবে তাকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে অসুস্থ
লেংরুং ম্রো গত ২৬ জুলাই হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। এর আগে তার বড় সন্তান তাইলেং ম্রো (৭) হামে আক্রান্ত হলে তাকেও হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। চার দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে সে বাড়ি ফিরে যায়।
তবে এবার দুই সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাদের দেখাশোনা করতে গিয়ে ২৮ জুলাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান লেংরুং। চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট ও যোগাযোগের সমস্যায় সেই পরামর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। লেংরুংয়ের স্বামী ক্রংসং ম্রো (২৮) অক্ষরজ্ঞানহীন এবং বাংলা ভাষায়ও ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। তার হাতে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না। চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি স্ত্রীকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
গ্রামে নেওয়ার পরই মৃত্যু
লেংরুংকে ২৯ জুলাই বিকেলে রুমার দুর্গম চিনিপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়। সেদিনই তার মৃত্যু হয়। পরদিন ৩০ জুলাই পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
পরিবারের সদস্য ক্রংতং ম্রো (১৯) জানান, হাসপাতালের নার্সরা তাকে বলেছেন, অসুস্থ সন্তানদের সেবা করতে গিয়েই লেংরুং নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
এদিকে মায়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানে না তার চার বছরের মেয়ে দংওয়াই ম্রো। শনিবার বান্দরবান সদর হাসপাতালের হামের রোগীদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল শিশুটি। তার ভাই কাইনওয়াই ম্রো সুস্থ হওয়ায় শুক্রবার দুপুরে এক আত্মীয় তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
হামে আক্রান্ত রুমার দুর্গম এলাকা
স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশুদের বাবা ক্রংসং ম্রোও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে শয্যাশায়ী। ফলে তিন শিশুর চিকিৎসা, দেখাশোনা এবং হাসপাতালে থাকা—সব দায়িত্ব এখন চাচা ক্রংতং ম্রোর ওপর।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দংওয়াই কখনো চাচার কোলে মাথা রাখছে, কখনো কান্না করছে। মায়ের মৃত্যুর খবর না জানলেও তার আচরণে স্বজন হারানোর শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রুমার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য এবং সময়মতো টিকা না পাওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৫ শিশু, ৬ নারী ও ৩ পুরুষ হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরে জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত হামে মারা গেছেন ৯ জন।
মা হারানো শিশুটির চিকিৎসার পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাম প্রতিরোধ ও আক্রান্তদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের সেবা করতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু
সন্তানদের সেবা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বান্দরবানের রুমার লেংরুং ম্রো। অর্থ ও যোগাযোগ সংকটে উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ার পর গ্রামে মৃত্যু হয় তার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















