প্রতি বর্ষা মৌসুমেই ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপালের সঙ্গে চীনের উত্তরাঞ্চলীয় বাণিজ্যপথগুলো বিপর্যস্ত হচ্ছে। সড়ক ভেঙে যাওয়া, সেতু ভেসে যাওয়া এবং পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের স্থলবাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়ছে। প্রায় এক দশক ধরে চলা এই সমস্যা চলতি বছরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ ভোক্তা—সবার ওপরই। বিশেষ করে তিজ, দশাইন ও তিহারের মতো বড় উৎসব সামনে থাকায় আমদানি পণ্যের চাহিদা বাড়ার সময় পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
ভূগোলের পাশাপাশি অব্যবস্থাপনাও দায়ী
নেপালের চীনের সঙ্গে প্রধান দুটি স্থলবাণিজ্যপথ তাতোপানি ও রাসুওয়াগাধি। দুটিই খাড়া পাহাড়, অস্থিতিশীল ঢাল ও দ্রুতগতির নদীর পাশ দিয়ে গেছে। বর্ষায় এসব এলাকায় প্রায় নিয়মিত ভূমিধস ও বন্যা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দুর্গম ভূপ্রকৃতিই সমস্যার কারণ নয়। দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। নেপাল জিওটেকনিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক কল্পনা অধিকারির মতে, সড়ক নির্মাণের সময় অনেক ক্ষেত্রে সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূপ্রকৃতি, ঢাল পরীক্ষা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তবে ঢাল পর্যালোচনা ও সুরক্ষার জন্য পৃথক বাজেটের সরকারি সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

তাতোপানিতে বাণিজ্য কার্যত বন্ধ
অরনিকো মহাসড়কের শেষ প্রান্তে ১৯৬৭ সাল থেকে চালু তাতোপানি সীমান্ত বর্তমানে তাতোপানি-বাহ্রাবিসে সড়কের ভূমিধসের কারণে পুরোপুরি বন্ধ। গত আট থেকে ১০ বছর ধরে প্রায় প্রতিটি বর্ষায় বিভিন্ন মাত্রার ভূমিধসে এই পথ সপ্তাহ বা মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পরও এলাকাটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ওই ভূমিকম্পের পর তাতোপানি দিয়ে চীনে নেপালের রপ্তানি আর পুনরায় চালু হয়নি, কারণ চীন বহির্মুখী পণ্য পরিবহনের জন্য সীমান্তটি খুলে দেয়নি।
স্বাভাবিক সময়ে তাতোপানি দিয়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাক চলাচল করত। সীমান্ত থেকে বছরে ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি রাজস্ব আয়ের আশা ছিল। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতেই সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য এখন বাস্তবায়নের বাইরে।
পরিবহন ব্যয় তিন গুণের বেশি
তাতোপানি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের পণ্য রাসুওয়াগাধি হয়ে চীনের কেরুং দিয়ে ঘুরিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটি চালানের পরিবহন ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার রুপি থেকে বেড়ে ৩ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পণ্য পৌঁছাতে সময়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রীষ্মের পণ্য শীতকালে পৌঁছাচ্ছে। পথে কনটেইনার আটকে থাকায় অতিরিক্ত খরচও গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
রাসুওয়াগাধিতেও একই চিত্র
রাসুওয়াগাধির স্যাব্রুবেসি-রাসুওয়াগাধি সড়কও বর্ষায় বারবার বন্যা ও ক্ষতির মুখে পড়ছে। ২০১৯ সালের নেপাল-চীন চুক্তির আওতায় চীনা অনুদানে সড়কটি উন্নয়নের কথা থাকলেও কাজ এখনো শেষ হয়নি।
গত বছরের জুলাইয়ে লেন্দে নদীর আকস্মিক বন্যায় নেপাল-চীন সংযোগকারী মিতেরি সেতু ভেসে যায় এবং কাস্টমস ইয়ার্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করা হলেও এর সক্ষমতা আগের সেতুর প্রায় অর্ধেক। ফলে দৈনিক পণ্য পরিবহন ৬০-৭০টি বোঝাই কনটেইনার থেকে কমে প্রায় ৩০-৪০টিতে নেমেছে।

রাসুওয়াগাধির সমন্বিত চেকপোস্টের নির্মাণও মাত্র ৬০ শতাংশের মতো শেষ হয়েছে। ফলে নেপালের কাস্টমস কার্যক্রম এখনো অস্থায়ী স্থাপনা থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও রপ্তানি অবকাঠামোর দুর্বলতা
কেরুং হয়ে পণ্য পরিবহনের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ছে। সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয়ও চলতি বছর প্রায় ৩০ শতাংশে উঠতে পারে, যা গত বছর ছিল ২২ শতাংশ।
অন্যদিকে, নেপাল-চীন বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতাও স্পষ্ট। গত অর্থবছরে তাতোপানি ও রাসুওয়াগাধি দিয়ে নেপালের আমদানি ছিল ৯৩ বিলিয়ন রুপির বেশি। বিপরীতে চীনে নেপালের রপ্তানি ২ বিলিয়ন রুপির নিচে ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রপ্তানি অবকাঠামোর ঘাটতিও বড় বাধা। চীনের উদ্ভিদস্বাস্থ্যবিষয়ক শর্ত পূরণে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও কোয়ারেন্টাইন সুবিধা নেপালে পর্যাপ্তভাবে কার্যকর নয়। পাশাপাশি দেশটির জাতীয় বাণিজ্য কৌশলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি পণ্যের বাজার হিসেবে চীনের তুলনায় ভারতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের কাঠামোও বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ২০১৮ সালের ট্রানজিট চুক্তিতে নেপালকে চীনের সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় কার্যপ্রণালি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সঙ্গে দুই বছর পরপর চুক্তি পর্যালোচনার বিধানও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে বর্ষায় সড়ক বিপর্যয় এখন শুধু সীমান্ত যোগাযোগের সমস্যা নয়; এটি নেপালের আমদানি ব্যয়, ভোক্তা মূল্য, রপ্তানি সক্ষমতা এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সম্পর্কের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















