আলবেনিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন মডেল গড়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহায়তায় দেশজুড়ে ২১৬টি ‘স্মার্টল্যাব’ স্থাপনের মাধ্যমে ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ডিজিটাল দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা ও প্রোগ্রামিং শেখার সুযোগ পাচ্ছে। ছয় বছর বয়সী শিশুরাও এসব প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে কোডিং ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ১৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়—এই তিন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ায় আলবেনিয়ার উদ্যোগটি কার্যকর হচ্ছে।
প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার নতুন সংযোগ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে স্মার্টবোর্ড, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শুধু সরঞ্জাম সরবরাহে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। শিক্ষকরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ না হলে এবং পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না এলে এসব যন্ত্র অনেক সময় অব্যবহৃতই থেকে যায়।
আলবেনিয়া সেই সীমাবদ্ধতা এড়াতে সমন্বিত পদ্ধতি নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়নে পরিচালিত গভটেক কর্মসূচির আওতায় দেশটির শিক্ষা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় শিক্ষাদান ও শিক্ষক উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়েছে। আর জাতীয় তথ্যসমাজ সংস্থা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সংযোগ নিশ্চিত করছে।
এ উদ্যোগের আওতায় এখন পর্যন্ত ৮০০ জনের বেশি শিক্ষক, আইসিটি শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং স্থানীয় শিক্ষা বিশেষজ্ঞকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে ডিজিটাল টুল, কোডিং এবং আরও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষে বাড়ছে অংশগ্রহণ
ডুরেসের বেদরি বেবেজিকি স্কুলের শিক্ষক মানুয়েলা ডোবি জানান, আগে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকই ছিলেন শিক্ষার মূল কেন্দ্র। এখন কম্পিউটার ও ট্যাবলেট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে কাজ করা, সমস্যা সমাধান এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
লেজের জর্জ কাস্ত্রিওটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ডিজে জেফির ভাষ্য, স্মার্টল্যাবে ক্লাস হবে শুনলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কম্পিউটার ব্যবহার, নতুন প্রোগ্রাম শেখা, গেম ও কুইজের মাধ্যমে পাঠ নেওয়া তাদের শেখার প্রতি উৎসাহ বাড়াচ্ছে।
তিরানার ভাচে জেলা স্কুলের শিক্ষক আনশেলা ন্দোজ বলেন, যারা সাধারণ শ্রেণিকক্ষে তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে, স্মার্টল্যাবে তারাই অনেক সময় সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ পেশা নিয়েও ভাবতে শুরু করছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায়ও প্রভাব
স্মার্টল্যাবের সুবিধা বিশেষভাবে পাচ্ছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। ভাচে জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এনকেলেদা গোরেজি জানান, প্রাথমিক স্তরের ১৫ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী স্মার্টল্যাবের পরিবেশে নিজেদের প্রকাশ ও সক্ষমতা প্রদর্শনের বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
পরিমাপযোগ্য সাফল্য
আলবেনিয়ার এই উদ্যোগের ফল ইতোমধ্যে মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। ডিজিটাল দক্ষতা, কোডিং, মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে মূল্যায়ন করা ৫ হাজার প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ৯৬ শতাংশই মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ডিজিটাল দক্ষতার মান পূরণ করেছে বা ছাড়িয়ে গেছে।
১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাতান দুমে ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চায়। তার লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করা নয়, নতুন প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। তার বাবার মতে, স্মার্টল্যাবের মাধ্যমে শিশুরা যে ডিজিটাল জ্ঞান অর্জন করছে, ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সম্ভবত অপরিহার্যও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















