নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ভিত্তি পানি। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবসা ও জ্বালানি খাত—বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রই পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১৭০ কোটি কর্মসংস্থানও পানির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৬ অর্জনের পথে বিশ্ব এখনো অনেক পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘ফান্ডিং আ ওয়াটার-সিকিউর ফিউচার’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও একটি বড় সমস্যা। পানি খাতে অর্থের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি যে অর্থ বাজেটে বরাদ্দ হচ্ছে, তারও উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হচ্ছে না।
বাজেট আছে, কিন্তু খরচ হচ্ছে না
২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পানি খাতে বাজেট বাস্তবায়নের গড় হার ছিল মাত্র ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে, প্রতি এক ডলারের মধ্যে প্রায় ২৮ সেন্ট শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়নি। সাব-সাহারান আফ্রিকায় পরিস্থিতি আরও দুর্বল; সেখানে গড় বাস্তবায়নের হার প্রায় ৬২ শতাংশ।
ফলে পানি সংকটে দ্বৈত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একদিকে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়ন কম, অন্যদিকে বরাদ্দ করা অর্থও পুরোপুরি কাজে লাগছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেই মানুষদের ওপর, যারা এখনো নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় আটকে যায় প্রকল্প
পানি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ সবসময় অর্থের অভাব বা সরকারের অনাগ্রহ নয়। অনেক ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।
প্রকল্প প্রস্তুতি দ্রুততার সঙ্গে করা হয়। এরপর জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় একাধিক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সংস্থাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় না থাকলে এসব ধাপ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তখন খুব অল্প সময় অবশিষ্ট থাকে। ফলে অব্যবহৃত অর্থ আবার সরকারি কোষাগারে ফেরত যায় এবং জরুরি পানি অবকাঠামো বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়ে।
বাজেট বরাদ্দ কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নয়
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, বাজেট বরাদ্দকে কেবল একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখলে হবে না; সেটিকে বাস্তবায়নযোগ্য বহু-বছর মেয়াদি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জমি, নকশা, ক্রয়প্রক্রিয়া ও নির্মাণ—প্রতিটি ধাপ ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে অর্থ বরাদ্দ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
এখানেই সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সামনে আসে। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করে কীভাবে অর্থ পরিকল্পনা, বরাদ্দ ও ব্যয় হবে। আর সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ঠিক করে কোন প্রকল্প নির্বাচন করা হবে, কীভাবে তা প্রস্তুত হবে এবং বাস্তবায়িত হবে।
মধ্যমেয়াদি ব্যয় পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য প্রকল্প তালিকা এবং খাতভিত্তিক লক্ষ্য ও বার্ষিক বাজেটের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে পানি খাতে বড় বরাদ্দ থাকলেও তা অবকাঠামো ও সেবায় রূপ নেওয়া কঠিন।

পরিকল্পিত ব্যয়ই পারে অর্থকে সেবায় রূপ দিতে
পানি খাত মূলত দীর্ঘমেয়াদি ও মূলধননির্ভর বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। তাই শুধু বেশি অর্থ বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়; বরং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সমন্বিত নীতি এবং আগে থেকেই প্রস্তুত প্রকল্প থাকা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়াটার ফরওয়ার্ড’ উদ্যোগও অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশভিত্তিক ‘ওয়াটার কমপ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের একটি অভিন্ন সংস্কার ও বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
পানি সংকট মোকাবিলায় অর্থায়ন বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বরাদ্দ করা অর্থকে বাস্তব প্রকল্প, অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য সেবায় রূপান্তর করতে হলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভালো প্রস্তুতি, সঠিক সময়ক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং কার্যকর বাজেট ব্যবস্থাপনা। অর্থ অনেক সময় বরাদ্দের টেবিলেই থাকে; চ্যালেঞ্জ হলো সেই অর্থকে মানুষের প্রয়োজনীয় সেবায় পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা।
পানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর বাজেট বাস্তবায়নই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















