রাশিয়ার কারা ব্যবস্থা নিজের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও কতটা অস্বচ্ছ, তা বহুদিনের পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দি ও আটক বেসামরিকদের ক্ষেত্রে এই অস্বচ্ছতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কোনো ব্যক্তি কোথায় আটক, কোন কারাগারে তাকে রাখা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না—এসব মৌলিক তথ্য জানতে গিয়ে পরিবারগুলোকে কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তথ্যের অভাব সব সময় তথ্য না থাকার কারণে নয়। বরং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পরস্পরবিরোধী উত্তর, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং আদালতের নথিতে তথ্য আড়াল করার প্রবণতা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে একজন বন্দিকে খুঁজে বের করার কাজ প্রায় গোয়েন্দা অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে।
পরিবারের জন্য প্রথম বাধাই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ
২০২৫ সালে রুশ সরকারি দপ্তরগুলোতে অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় সেবা পোর্টাল গসুস্লুগির মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হওয়ার পর ইউক্রেনীয় পরিবারগুলোর জন্য বন্দিদের সন্ধানে পুরোনো পদ্ধতিও প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
কয়েক শ পরিবার এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে বলে অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন। ই-মেইলে যোগাযোগের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু বিদেশি ঠিকানা থেকে রুশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে উত্তর পাওয়া কঠিন। তার ওপর ইউক্রেনীয় বন্দিদের রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের কারাগারে ছড়িয়ে রাখা হয়। ফলে কোন কারাগারে আবেদন পাঠানো উচিত, সেটিই অনেক সময় অজানা থাকে।
অধিকারকর্মীরা আগে একসঙ্গে বিভিন্ন আঞ্চলিক কারা দপ্তরে আবেদন পাঠাতে পারতেন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় সেই পথও সংকুচিত হয়েছে। আর যেসব উত্তর পাওয়া যায়, সেগুলোর অনেকগুলোতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, বন্দির সম্মতি কিংবা দায়িত্ব অন্য মন্ত্রণালয়ের—এ ধরনের কারণ দেখানো হয়।
তথ্য নেই, নাকি তথ্য দিতে অনীহা?
এখানেই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। রাশিয়ার কারা ব্যবস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দিদের অবস্থান সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তারিত রেকর্ড থাকার কথা। কে কোথায় আছেন, তাকে কোথা থেকে কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছে, এমনকি কোনো পরিবহন বহরে থাকলে তার গন্তব্য কী—এসব তথ্য প্রশাসনের জানা থাকার কথা।
তাহলে পরিবারের কাছে সেই তথ্য পৌঁছায় না কেন?
কখনো একটি কারাগার জানায়, তারা তথ্য দিতে পারবে না কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। কোথাও বলা হয়, বন্দির ব্যক্তিগত সম্মতি ছাড়া তার অবস্থান জানানো সম্ভব নয়। আবার কোনো দপ্তর পরিবারকে অন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠায়। ফলে একই ব্যক্তিকে নিয়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন উত্তর পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই অসঙ্গতি নিছক আমলাতান্ত্রিক দুর্বলতা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যায় না। কারণ একজন বন্দির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য রাষ্ট্রের হাতে থাকার পরও তা পরিবারের কাছে পৌঁছাতে না দেওয়া কার্যত তাদের অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘায়িত করে।
আদালতও যখন তথ্য গোপন করে
কোনো ইউক্রেনীয় বন্দির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলে তার অবস্থান শনাক্ত করার নতুন কিছু পথ তৈরি হয়। কিন্তু আদালত ব্যবস্থাতেও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা নেই।
ইউক্রেনীয় সেনাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা রাশিয়ার সামরিক আদালতে পরিচালিত হয়। কিছু বিচার ভিডিও সংযোগে, কিছু আদালতের নির্ধারিত স্থানের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে পরিবারের পক্ষে আদালতের নাম অনুমান করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদালতের প্রকাশ্য নথিতে অভিযুক্তদের নাম গোপন করার প্রবণতা। বিশেষ করে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আইনের আওতায় অভিযুক্ত ইউক্রেনীয়দের ক্ষেত্রে কিছু আদালত তাদের নাম অনলাইনে প্রকাশ করা বন্ধ করেছে। ফলে একজন পরিবার সদস্য জানতেই পারেন না তার স্বজনের বিরুদ্ধে কোথায় বিচার চলছে।
তবু রায়ের পর আদালতের নথি কখনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। সাজা কার্যকর হওয়ার পর বন্দিকে কোথায় পাঠানো হয়েছে, সেই তথ্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদালতে পৌঁছানোর কথা। আইনজীবী সেই নথি পর্যালোচনা করতে পারলে বন্দির অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াও ধীর, ব্যয়বহুল এবং সব সময় সফল হয় না।
একটি চিঠি, একটি অর্থপ্রেরণ—হয়ে উঠছে অনুসন্ধানের সূত্র
আইন বন্দিদের চিঠিপত্রের অধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তবতা অনেক জটিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্দির চিঠি বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। আবার পরিবারের পাঠানো চিঠিও তার হাতে পৌঁছায় না। ফলে যোগাযোগের যে পথটি একজন বন্দির অস্তিত্ব নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারত, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে যায়।
কখনো অনলাইন চিঠি পাঠানোর সেবা সাহায্য করে। বন্দি যদি সংশ্লিষ্ট কারাগারে না থাকেন, কিছু সেবা প্রেরককে তা জানায়। কিন্তু রাশিয়ার সব কারাগার এসব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়।
এমনকি বন্দির হিসাবে পাঠানো অর্থও কখনো অনুসন্ধানের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। টাকা পাঠানোর পর তা ফেরত না এলে ধারণা করা যায়, প্রাপক ওই কারাগারেই থাকতে পারেন।
অন্যদিকে রুশপন্থী টেলিগ্রাম চ্যানেলে বন্দিদের নিয়ে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওও কখনো পরিবারের জন্য সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। অধিকারকর্মীরা এসব উপকরণ থেকে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়ভাবে যে তথ্য প্রকাশ করা হয় না, প্রচারণামূলক কনটেন্টের মধ্য থেকেই কখনো তার টুকরো টুকরো অংশ বেরিয়ে আসে।
আইনজীবী থাকলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়
কোনো বন্দির সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলেও আইনজীবীর সাক্ষাৎ সব সময় নিশ্চিত হয় না। এমন অভিযোগ রয়েছে যে আইনজীবীকে বলা হয়েছে, বন্দি নিজেই তার সঙ্গে দেখা করতে চাননি। কিন্তু পরে একই ব্যক্তির কাছ থেকে পরিবারের কাছে আইনজীবীর সহায়তা চেয়ে বার্তা পৌঁছেছে।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, কারাগারের ভেতরের তথ্য ও বন্দির নিজের বক্তব্যের মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি হতে পারে। বন্দিরা নিজের অবস্থার আরও অবনতি হবে—এই আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষকে অসন্তুষ্ট করার মতো কোনো পদক্ষেপ নিতেও ভয় পেতে পারেন।
আর যাদের কোনো আইনি পরিচয়ই নেই?
সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন তারা, যাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য ফৌজদারি মামলা নেই এবং যাদের কোনো স্বীকৃত আইনি অবস্থাও নেই। তাদের কারাগারে রাখা হতে পারে, কিন্তু তারা কোথায় আছেন, কেন আটক এবং কতদিন আটক থাকবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর পরিবারের কাছে থাকে না।
এ ধরনের বন্দিদের ক্ষেত্রে আইনজীবীর সাক্ষাৎ বা চিঠিপত্রের সুযোগও নাও থাকতে পারে। ফলে তাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায় বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া অন্য ইউক্রেনীয়দের সাক্ষ্য।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি ইউক্রেনীয় পক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক জিম্মিদের আটকে রাখার ১৮৬টি পরিচিত স্থান রয়েছে এবং এর মধ্যে ২৯টিতে নিয়মিত নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের বর্ণনাতেও রাশিয়ার কিছু আটককেন্দ্রে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
নীরবতা নিজেই যখন বন্দিত্বের অংশ
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হলো—একজন বন্দিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব ক্রমশ তার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথায় মামলা হয়েছে, কোন আদালতে বিচার চলছে, কোন কারাগারে পাঠানো হয়েছে—এসব তথ্য জানতে তাদের আইনজীবী নিয়োগ করতে হচ্ছে, বিভিন্ন অঞ্চলে আবেদন পাঠাতে হচ্ছে, আদালতের নথি অনুসরণ করতে হচ্ছে এবং কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণামূলক ভিডিও পর্যন্ত খুঁজে দেখতে হচ্ছে।
এটি স্বাভাবিক আইনি ব্যবস্থার চিত্র নয়। কোনো রাষ্ট্র একজন মানুষকে আটক করলে তার অবস্থান, আইনি মর্যাদা এবং আটক রাখার কারণ সম্পর্কে ন্যূনতম তথ্য তার পরিবারের জানার সুযোগ থাকা উচিত। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরাপত্তাজনিত কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই যুক্তি যদি একজন মানুষের অস্তিত্বকেই অনিশ্চিত করে তোলে, তখন বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক গোপনীয়তার মধ্যে থাকে না।
ইউক্রেনীয় বন্দিদের খোঁজে অধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের লড়াই তাই কেবল নিখোঁজ স্বজনকে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা নয়। এটি রাষ্ট্রের তথ্য-নিয়ন্ত্রণ, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং বন্দিদের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে আনে।
সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব সরল: কোনো রাষ্ট্র একজন মানুষকে আটক করার ক্ষমতা রাখলে, তার পরিবারকে অন্তত সেই মানুষটি কোথায় আছে—এটুকু জানানোর দায় কি সেই রাষ্ট্রের নেই?
যদি সেই উত্তরও পাওয়া না যায়, তাহলে নীরবতা আর প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকে না। সেটিই হয়ে ওঠে বন্দিত্বের আরেকটি স্তর—যেখানে মানুষটি কারাগারের ভেতরে, আর তার পরিবার আটকে থাকে অনিশ্চয়তার বাইরে।
দিমিত্রি শভেতস 



















