আইনজীবী ও আইন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন সুবিধা চালু করেছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটি তাদের জেমিনি এন্টারপ্রাইজ প্ল্যাটফর্মে আইন খাতের জন্য বিশেষ সরঞ্জাম যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত ও জটিল আইনি কাজের বড় একটি অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পরিচালনা করা যাবে বলে জানিয়েছে গুগল।
আইনজীবীদের কাজ সহজ করার লক্ষ্য
গুগলের নতুন ‘জেমিনি এন্টারপ্রাইজ ফর লিগ্যাল’ মূলত আইন প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন ও জটিল কাজকে দ্রুত এবং কার্যকর করার জন্য তৈরি। গুগলের দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়মিত কাজের দায়িত্ব নিলে আইনজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরামর্শ, কৌশল নির্ধারণ এবং ক্লায়েন্টদের জন্য উচ্চমূল্যের সেবায় বেশি সময় দিতে পারবেন।
প্ল্যাটফর্মটিতে আইন খাতের বিভিন্ন সফটওয়্যার ও তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের সুবিধা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এমন কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সহকারী যুক্ত করা হয়েছে, যারা বিশেষায়িত আইনি ও প্রশাসনিক কাজ মানুষের সীমিত তদারকিতেই সম্পন্ন করতে পারবে।
গুগল জানিয়েছে, আইন প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখেই এসব সুবিধা ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আইনি গবেষণা থেকে নথি তৈরিতে এআই
আইনজীবীদের মধ্যে উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আইনি গবেষণা, আদালতে দাখিলের নথি তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য আইনি কাজে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে।
শুধু আইনি কাজ নয়, ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনা, মামলা পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো সময় ও ব্যয় কমিয়ে কাজের দক্ষতা বাড়ানো।
গুগল ক্লাউডের পণ্য বিভাগের পরিচালক অমৃতা মেহরোক জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থা আইন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নমনীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্ল্যাটফর্মে থাকা বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল বেছে নিতে পারবে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা
আইন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। গুগলের পাশাপাশি অ্যানথ্রপিকসহ বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক গ্রাহকদের জন্য নিজেদের সেবা সম্প্রসারণ করেছে।
আইন খাতে এই প্রতিযোগিতায় থমসন রয়টার্সও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি আইন গবেষণার নিজস্ব তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে তৈরি একটি বৃহৎ ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল চালু করেছে। পেশাদার কাজের জন্য তৈরি ওই ব্যবস্থায় বহু বছরের আইনসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গুগল জানিয়েছে, তাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম থমসন রয়টার্স, হার্ভে, লেক্সিসনেক্সিসসহ বিভিন্ন আইনপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার সঙ্গে নিরাপদভাবে যুক্ত হতে পারবে।

বড় আইন প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হচ্ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বের বড় আইন প্রতিষ্ঠানগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ওয়েল গটশাল, ক্লিয়ারি গটলিব, ফ্রেশফিল্ডস এবং উইলিয়ামস অ্যান্ড কনোলিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গুগলের নতুন উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করছে।
ওয়েল গটশালের সহ-ব্যবস্থাপনা অংশীদার জোনাথন সোলার বলেন, ক্লায়েন্টরা এখন ক্রমেই প্রত্যাশা করছেন যে তাদের আইনজীবীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবেন এবং এর মাধ্যমে কাজের দক্ষতা বাড়াবেন।
ক্লিয়ারি গটলিবের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জেফরি কার্পফের মতে, গুগলের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আইন প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সরঞ্জাম তৈরির প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেবে।

আইন পেশায় বদলের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখনো পরিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও নতুন নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে আগামী দিনে আইনজীবীদের কাজের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করা, নথি বিশ্লেষণ এবং প্রাথমিক খসড়া তৈরির মতো কাজে সময় বাঁচাতে পারলেও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের ক্ষেত্রে মানবিক বিচারবোধের প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের আইন পেশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইনজীবীদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার চেয়ে তাদের কাজের শক্তিশালী সহকারী হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গুগলের এই উদ্যোগ সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি বড় ইঙ্গিত। আইন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই আইনজীবীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং আইনি জ্ঞানের পাশাপাশি নতুন ধরনের পেশাগত সক্ষমতার প্রয়োজন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















