মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যেতে পারে—এমন প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম টানা কয়েক দিন ধরে কমছে। বৃহস্পতিবারও এই দরপতন অব্যাহত থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলার ২৪ সেন্টে নেমে আসে। এ নিয়ে টানা চতুর্থ দিন ব্রেন্টের দাম কমল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দাম ৫৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ৬৭ সেন্ট হয়েছে। এই তেলের দাম টানা পঞ্চম দিন কমেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনায় আশার সঞ্চার
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা নিয়ে একটি চুক্তির বিস্তারিত চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। বুধবার ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র এ তথ্য জানায়। এর আগে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছিল, দুই দেশ উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এবং এর আয় কীভাবে ভাগ করা হবে, সে বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর ইরান জলপথটি বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে সেখানে তেল পরিবহনের পরিমাণ যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায় তেলের দামে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
কূটনৈতিক তৎপরতায় নজর বাজারের
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ইরানে যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত বন্ধে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর লক্ষ্যেই তাঁর এই সফর।
যুক্তরাষ্ট্রও প্রায় এক মাস ধরে ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে এবং দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান এখনো অনেক দূরে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান উপসাগর ও প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলাও চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুনে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
ডিজেল সরবরাহ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও বিশ্বজুড়ে ডিজেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার একাধিক শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া থেকে রপ্তানিও কমেছে।
এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মজুতের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে। ২১ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে ডিজেল ও উত্তাপের তেলসহ পাতিত জ্বালানির মজুত ২২ লাখ ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৩৪ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগস্টের এই সময়ের জন্য এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বনিম্ন মজুত। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও ডিজেল বাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি এখনো যথেষ্ট রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পুরোপুরি থামার আগে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















