নেপাল-চীন সীমান্তে ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ শুক্রবার উপচে পড়তে শুরু করেছে। এতে দুই দিন আগে আকস্মিক বন্যায় বিধ্বস্ত নেপালের রসুয়া জেলায় নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকি বাড়ায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ে ছুটছেন আতঙ্কিত মানুষ
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলার বাসিন্দাদের নদীর পানি বাড়তে দেখে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দ্রুত উঁচু পাহাড়ি এলাকায় উঠে যেতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনের উদ্ধারকারী দল ও যানবাহনগুলোও নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। হ্রদটি ভেঙে গেলে নিচের দিকে আবারও প্রবল পানির স্রোত নেমে আসতে পারে।
হ্রদে জমেছে ২৫ লাখ ঘনমিটার পানি
ভূমিধসের ফলে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে যে হ্রদটি তৈরি হয়েছে, সেটিতে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। এক দিন আগেও সেখানে পানির পরিমাণ আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার ছিল।
হ্রদটির অবস্থা পর্যবেক্ষণে চীন আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে। দলটি আকাশপথে পর্যবেক্ষণ এবং ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে হ্রদের কাঠামো ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯
বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপালে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক।
হিমালয়ের নদী অববাহিকায় হিমবাহ ধসের পর বিশাল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ প্রচণ্ড স্রোতে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে গ্রামের পর গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে।
কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পথটি পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও পর্বতারোহীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্ধারকারীদের কঠিন অভিযান
বিধ্বস্ত এলাকায় আটকে পড়া মানুষের সন্ধানে নেপালের উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। দুর্গম শহর ও উপত্যকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে জরুরি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধারকর্মীরা প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করেও ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছেন। নদীর স্রোতে ভেসে সমতল এলাকায় চলে আসা বহু মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
রসুয়া থেকে বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া দিবগা তামাং জানান, তাঁর পরিচিত প্রায় সবাই মারা গেছেন। স্বজন ও পরিচিতদের হারিয়ে তিনি বলেন, তাঁর জন্য অপেক্ষা করার মতোও আর কেউ নেই।
সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ধ্বংস
চীন-নেপাল সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ গ্যিরং প্রবেশপথেও বন্যার ভয়াবহতা দেখা গেছে। বুধবারের দৃশ্য ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে কাদামাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত সীমান্ত এলাকার স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তিব্বতের গ্যিরং কাউন্টিতে এখনো ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার দুর্যোগকবলিত গ্যিরং এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাঁর এই সফর থেকে বোঝা যাচ্ছে, চীন দুর্যোগটিকে অত্যন্ত উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করছে।
স্বজনদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না
নিখোঁজদের স্বজনেরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রিয়জনদের খবর পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা স্নেহা সুধীরের স্বামীসহ উত্তর ভার্জিনিয়ার কয়েকজন ব্যক্তি নেপাল থেকে তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। দুর্যোগের পর তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সুধীর জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা একে অন্যকে মানসিকভাবে সহায়তা করছেন এবং সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বজনদের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিদেশি সহায়তা নিয়ে নেপালের অবস্থান
বিভিন্ন দেশ নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও আপাতত বিদেশি উদ্ধারকারী দল প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে নেপাল সরকার। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল ইতোমধ্যে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছে। তবে নেপাল সরকার বিদেশি উদ্ধারকারী দল মোতায়েনের পরিকল্পনা না করায় তাদের এখনো দুর্যোগ এলাকায় পাঠানো হয়নি।
এদিকে নতুন করে হ্রদ উপচে পড়ায় উদ্ধার অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি এখন উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন করে নেমে আসতে পারে এমন পানির ঢল থেকে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই দুর্যোগে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। তার ওপর পাহাড়ি নদীর উৎস এলাকায় তৈরি নতুন জলাধারগুলোর পানি বাড়তে থাকায় হিমালয়সংলগ্ন জনপদগুলোতে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভূমিধসে তৈরি হ্রদ উপচে পড়ায় নতুন বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ, চলছে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















