০৭:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
অর্থনীতি ভালো দেখালেও কেন স্বস্তিতে নেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ নেপালের ভোতে কোশি: বন্যা নয়, প্রস্তুতির ঘাটতিই বড় বিপদ জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন: স্বচ্ছতার দাবিতে মিসরের কূটনৈতিক চাপ নেপালে ভয়াবহ ভোতেকোশি বন্যা: বাড়ছে মরদেহ উদ্ধারের চাপ বন্যার্তদের একা ফেলে রাখার সময় নয় চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু পরিবারসহ চট্টগ্রামে আটক ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কঠোর, কৌশলী ভারসাম্যের পথে পাকিস্তান পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পিমসের আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু: কাউকে ছাড় নয়, স্বাস্থ্য খাতে আমূল সংস্কারের ডাক নেপালের বন্যা মোকাবিলায় অর্থসংস্থান: ত্রাণের পর আসল পরীক্ষা পুনর্গঠন সিলেটে হামের মতো উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, চলতি বছরে মৃতের সংখ্যা ১৫১

বাংলাদেশের প্রজন্ম-জেড পাকিস্তানি গান এত বেশি পছন্দ করে কেন

ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টা। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। মঞ্চের সামনে পানি জমে গেছে, দর্শকদের অনেকেই ভিজে একাকার। তবু কেউ অনুষ্ঠানস্থল ছাড়ছিলেন না। বরং সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় আরও বাড়ছিল।

এই ভিড়ের একজন ছিলেন ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলিফ। প্রিয় শিল্পী আতিফ আসলামের গান শুনতে তিনি কুমিল্লা থেকে ১০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন।

আলিফের ভাষায়, ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি আতিফ আসলামের গান শুনছেন। এত বছর পর প্রিয় শিল্পীকে সরাসরি মঞ্চে দেখার অনুভূতিকে তাঁর কাছে মনে হয়েছে স্বপ্নপূরণের মতো।

রাত ৮টা ৫২ মিনিটে আতিফ আসলাম মঞ্চে উঠতেই হাজারো দর্শকের কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনিত হয়—‘আতিফ! আতিফ!’ এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একের পর এক জনপ্রিয় গানে মেতে ওঠে পুরো আয়োজন। দীর্ঘ অপেক্ষা, বৃষ্টি আর ভেজা পোশাক—কিছুই তখন দর্শকদের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

অনলাইন গানের তালিকা থেকে কনসার্টের ভিড়ে

বাংলাদেশে পাকিস্তানি সংগীত হঠাৎ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের ব্যক্তিগত গানের তালিকা ও অনলাইন সংগীতের জগতে পাকিস্তানি শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জনপ্রিয়তাই শুধু আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনে আসছেন। দীর্ঘ সময় এই আগ্রহ মূলত ব্যক্তিগত গানের তালিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক শ্রোতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

২০২৪ সালের পর পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। দুই দেশের যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের সরাসরি সংগীত পরিবেশনের সুযোগও বাড়তে থাকে।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। এরপর একের পর এক কনসার্ট যেন সামনে নিয়ে আসে দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা—অনলাইনে বছরের পর বছর পাকিস্তানি গান শুনে তৈরি হওয়া বিশাল শ্রোতাগোষ্ঠী এবার সরাসরি কনসার্টের মাঠে একত্রিত হচ্ছে।ঢাকায় আতিফ আসলামের কনসার্টও স্থগিত | কালবেলা

আতিফ আসলাম থেকে রাহাত ফতেহ আলী খান

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একজন আতিফ আসলাম। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় কনসার্টে গান করেন তিনি। একই বছরের নভেম্বরে আবারও বাংলাদেশে আসেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানেও গান করেন তিনি। সর্বশেষ ২৪ জুলাই ঢাকার বড় একটি কনসার্টে প্রধান শিল্পী হিসেবে মঞ্চে ওঠেন আতিফ।

২৩ জুলাই ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে আতিফ আসলাম বাংলাদেশকে তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গান করলেও বাংলাদেশের দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাসের মতো অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও খুব কমই পেয়েছেন।

তবে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় পাকিস্তানি শিল্পীর তালিকায় শুধু আতিফ আসলাম নেই।

রাহাত ফতেহ আলী খান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দুটি কনসার্টে গান করেন। পাকিস্তানি ব্যান্ড জালও ১৪ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে আসে।

২০২৫ সালে আইমা বেগ, কাভিশ এবং রক্সেন ব্যান্ডের প্রধান শিল্পী মুস্তাফা জাহিদ ঢাকায় প্রথমবারের মতো সংগীত পরিবেশন করেন। আতিফ আসলামের সঙ্গে ২০২৪ সালে গান করা আবদুল হান্নানও ২০২৫ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন।

২০২৬ সালে বায়ান প্রথমবারের মতো ঢাকায় কনসার্ট করে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মুর্তজা কিজিলবাশের বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংগীত পরিবেশনের কথা রয়েছে। একইভাবে হাসান রহিমেরও বাংলাদেশে আসার আয়োজন রয়েছে।

আতিফ আসলাম ও রাহাত ফতেহ আলী খানের মতো শিল্পীদের কনসার্ট এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংগীত আয়োজনগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় আসছেন। টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও চাহিদা কমছে না।

অনেক তরুণের কাছে এসব কনসার্ট শুধু গান শোনার অনুষ্ঠান নয়। বছরের পর বছর অনলাইনে শোনা প্রিয় শিল্পীকে সরাসরি দেখার পাশাপাশি একই ধরনের সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করছে এসব আয়োজন।

পাকিস্তানি গান বাংলাদেশের তরুণদের এত ভালো লাগে কেন

ঢাকার বিশিষ্ট গীতিকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফয়সাল রব্বিকিনের মতে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পাকিস্তানি শিল্পীদের জনপ্রিয়তা নতুন কোনো বিষয় নয়।

তাঁর মতে, বহু পাকিস্তানি শিল্পী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হলে এবং সম্পর্ক উন্নত হলে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের কনসার্টের সংখ্যা বাড়াও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েবও প্রায় একই মত দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষ বহু দশক ধরেই পাকিস্তানি সংগীত শুনে আসছে। বিশেষ করে গজলের প্রতি বাংলাদেশের শ্রোতাদের আগ্রহ অনেক পুরোনো।

তবে আগে বিদেশি গান শোনার সুযোগ ছিল তুলনামূলক সীমিত। বেতার ও টেলিভিশন ছিল প্রধান মাধ্যম। এখন ইন্টারনেট ও অনলাইন সংগীতের বিভিন্ন মাধ্যমের কারণে তরুণরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গান নিজেরাই খুঁজে নিতে পারছেন।

ফলে কোনো দেশের গান শুনবেন, সেটি ঠিক করে দেওয়ার মতো মধ্যস্থতা এখন অনেকটাই কমে গেছে। তরুণরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান শুনছেন এবং পছন্দের শিল্পী বেছে নিচ্ছেন।

‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’ যেভাবে নতুন শ্রোতা তৈরি করেছে

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে পাকিস্তানি সংগীত জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’-এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

লোকসংগীত, কাওয়ালি ও আধুনিক পপ সংগীতের সমন্বয়ে তৈরি গানগুলো অনলাইনে বিপুলসংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউটিউবের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি সংগীতের নতুন ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে।

একই সময়ে অনলাইন সংগীতের বিভিন্ন মাধ্যম তরুণদের জন্য বলিউডের প্রচলিত জনপ্রিয় গানের বাইরেও নতুন শিল্পী ও নতুন ধরনের সংগীত আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করেছে।

২৪ বছর বয়সী মারিন আমিন ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানি গান শুনছেন। ঢাকায় রাহাত ফতেহ আলী খান ও আতিফ আসলামের একাধিক কনসার্টেও অংশ নিয়েছেন তিনি।

মারিনের মতে, পাকিস্তানি সংগীতে এমন কিছু রয়েছে, যা অন্য ধরনের অনুভূতি তৈরি করে। শিল্পীরা যেভাবে গান পরিবেশন করেন, তা তাঁর কাছে খুব আকর্ষণীয়। অনেক গান শুনলে তাঁর মনে হয়, সেগুলো যেন তাঁর নিজের জীবনের গল্পই বলছে।

আর এখানেই হয়তো পাকিস্তানি গানের বড় আকর্ষণ—গান শুধু শোনা নয়, তার কথা ও আবেগের সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া।

ভারতীয় সিনেমা থেকেও পাকিস্তানি গানের পরিচিতি

বাংলাদেশি তরুণ গায়ক অ্যাঞ্জেল নূরের মতে, ভারতীয় সিনেমাও বাংলাদেশের মানুষের কাছে পাকিস্তানি গান পরিচিত করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে তাঁর মতে, কোনো গান একবার শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর পর তাকে ধরে রাখে গানের মান। পাকিস্তানি গানের মান ভালো বলেই বাংলাদেশের শ্রোতারা বারবার সেসব গানে ফিরে আসছেন।

এই প্রভাব তাঁর নিজের সংগীতচর্চাতেও পড়েছে। তাঁর আসন্ন ১২টি গানের একটি অ্যালবামে পাকিস্তানি সংগীতের কিছু উপাদান রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। অ্যালবামের সংগীতায়োজনেও পাকিস্তানি শিল্পীদের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ পাকিস্তানি সংগীতের প্রভাব এখন শুধু বাংলাদেশের তরুণদের শ্রোতা হিসেবে পছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি শিল্পীদের সৃষ্টিশীল কাজেও সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে।মাজারে গান গেয়ে তীব্র সমালোচনায় রাহাত ফতেহ আলী

সংগীতের কাছে জাতীয়তা নয়, মানটাই গুরুত্বপূর্ণ

সংগীতের ক্ষেত্রে শ্রোতারা শিল্পীর জাতীয়তার চেয়ে গানের মানকে বেশি গুরুত্ব দেন বলে মনে করেন মোহাম্মদ শোয়েব।

একজন শ্রোতা যখন কোনো গান শোনেন, তখন তিনি সবসময় ভাবেন না শিল্পী ভারতীয় না পাকিস্তানি। বরং তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সুর, কণ্ঠ, গানের কথা এবং পরিবেশনার ধরন।

পাকিস্তানি সংগীতের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্যই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এর শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছে।

ফয়সাল রব্বিকিনের মতে, পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা শুধু কয়েকজন তারকার সাফল্যের ফল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময়, অনলাইন সংগীতের বিস্তার এবং তরুণদের পরিবর্তিত সংগীতরুচি।

তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্ম শিল্পীর পাসপোর্ট দেখে গান বেছে নেয় না। তারা গানটি ভালো কি না, সেটিই আগে দেখে।

তবে সাংস্কৃতিক বিনিময় যেন একতরফা না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি শিল্পীরা যেমন বাংলাদেশে এসে গান করছেন, তেমনি বাংলাদেশের শিল্পীদেরও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত সংগীত পরিবেশনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

বৃষ্টিভেজা কনসার্টে বদলে যাওয়া সংগীতরুচির ছবি

২৪ জুলাই মাদানী অ্যাভিনিউয়ের সেই বৃষ্টিভেজা রাত বাংলাদেশের তরুণদের সংগীতরুচির একটি পরিবর্তনকে যেন চোখের সামনে তুলে ধরেছিল।

কুমিল্লা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসা আলিফের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে যে শিল্পীর গান শুনেছেন, সেই শিল্পীকে অবশেষে নিজের চোখের সামনে গান গাইতে দেখেছেন তিনি।

অন্যদিকে মুশফিকা জাহান পরিবারের অনুমতি না পাওয়ায় কনসার্টে যেতে পারেননি। কিন্তু ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

একজন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে সরাসরি গান শুনেছেন, আরেকজন দূরে বসে পর্দার মাধ্যমে সেই মুহূর্ত অনুসরণ করেছেন। কিন্তু দুজনের অনুভূতিতে ছিল একই টান—প্রিয় সংগীতের প্রতি ভালোবাসা।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা তাই শুধু একটি দেশের গান অন্য দেশের তরুণদের পছন্দ করার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনলাইন সংগীতের বিস্তার, সহজ যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, গানের মান এবং সবচেয়ে বড় কথা—শ্রোতার নিজের পছন্দ।

সীমান্ত, ভাষা কিংবা জাতীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ভালো সুর ও আবেগ যখন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তখন সংগীতই হয়ে ওঠে দুই দেশের মানুষের মধ্যে এক নীরব সেতু।

জনপ্রিয় সংবাদ

অর্থনীতি ভালো দেখালেও কেন স্বস্তিতে নেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ

বাংলাদেশের প্রজন্ম-জেড পাকিস্তানি গান এত বেশি পছন্দ করে কেন

০৫:৪৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টা। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। মঞ্চের সামনে পানি জমে গেছে, দর্শকদের অনেকেই ভিজে একাকার। তবু কেউ অনুষ্ঠানস্থল ছাড়ছিলেন না। বরং সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় আরও বাড়ছিল।

এই ভিড়ের একজন ছিলেন ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলিফ। প্রিয় শিল্পী আতিফ আসলামের গান শুনতে তিনি কুমিল্লা থেকে ১০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন।

আলিফের ভাষায়, ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি আতিফ আসলামের গান শুনছেন। এত বছর পর প্রিয় শিল্পীকে সরাসরি মঞ্চে দেখার অনুভূতিকে তাঁর কাছে মনে হয়েছে স্বপ্নপূরণের মতো।

রাত ৮টা ৫২ মিনিটে আতিফ আসলাম মঞ্চে উঠতেই হাজারো দর্শকের কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনিত হয়—‘আতিফ! আতিফ!’ এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একের পর এক জনপ্রিয় গানে মেতে ওঠে পুরো আয়োজন। দীর্ঘ অপেক্ষা, বৃষ্টি আর ভেজা পোশাক—কিছুই তখন দর্শকদের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

অনলাইন গানের তালিকা থেকে কনসার্টের ভিড়ে

বাংলাদেশে পাকিস্তানি সংগীত হঠাৎ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের ব্যক্তিগত গানের তালিকা ও অনলাইন সংগীতের জগতে পাকিস্তানি শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জনপ্রিয়তাই শুধু আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে পাকিস্তানি শিল্পীদের গান শুনে আসছেন। দীর্ঘ সময় এই আগ্রহ মূলত ব্যক্তিগত গানের তালিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক শ্রোতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

২০২৪ সালের পর পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। দুই দেশের যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের সরাসরি সংগীত পরিবেশনের সুযোগও বাড়তে থাকে।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। এরপর একের পর এক কনসার্ট যেন সামনে নিয়ে আসে দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতা—অনলাইনে বছরের পর বছর পাকিস্তানি গান শুনে তৈরি হওয়া বিশাল শ্রোতাগোষ্ঠী এবার সরাসরি কনসার্টের মাঠে একত্রিত হচ্ছে।ঢাকায় আতিফ আসলামের কনসার্টও স্থগিত | কালবেলা

আতিফ আসলাম থেকে রাহাত ফতেহ আলী খান

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একজন আতিফ আসলাম। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় কনসার্টে গান করেন তিনি। একই বছরের নভেম্বরে আবারও বাংলাদেশে আসেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানেও গান করেন তিনি। সর্বশেষ ২৪ জুলাই ঢাকার বড় একটি কনসার্টে প্রধান শিল্পী হিসেবে মঞ্চে ওঠেন আতিফ।

২৩ জুলাই ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে আতিফ আসলাম বাংলাদেশকে তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গান করলেও বাংলাদেশের দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাসের মতো অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও খুব কমই পেয়েছেন।

তবে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় পাকিস্তানি শিল্পীর তালিকায় শুধু আতিফ আসলাম নেই।

রাহাত ফতেহ আলী খান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় দুটি কনসার্টে গান করেন। পাকিস্তানি ব্যান্ড জালও ১৪ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে আসে।

২০২৫ সালে আইমা বেগ, কাভিশ এবং রক্সেন ব্যান্ডের প্রধান শিল্পী মুস্তাফা জাহিদ ঢাকায় প্রথমবারের মতো সংগীত পরিবেশন করেন। আতিফ আসলামের সঙ্গে ২০২৪ সালে গান করা আবদুল হান্নানও ২০২৫ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন।

২০২৬ সালে বায়ান প্রথমবারের মতো ঢাকায় কনসার্ট করে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মুর্তজা কিজিলবাশের বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংগীত পরিবেশনের কথা রয়েছে। একইভাবে হাসান রহিমেরও বাংলাদেশে আসার আয়োজন রয়েছে।

আতিফ আসলাম ও রাহাত ফতেহ আলী খানের মতো শিল্পীদের কনসার্ট এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংগীত আয়োজনগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় আসছেন। টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও চাহিদা কমছে না।

অনেক তরুণের কাছে এসব কনসার্ট শুধু গান শোনার অনুষ্ঠান নয়। বছরের পর বছর অনলাইনে শোনা প্রিয় শিল্পীকে সরাসরি দেখার পাশাপাশি একই ধরনের সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করছে এসব আয়োজন।

পাকিস্তানি গান বাংলাদেশের তরুণদের এত ভালো লাগে কেন

ঢাকার বিশিষ্ট গীতিকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফয়সাল রব্বিকিনের মতে, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পাকিস্তানি শিল্পীদের জনপ্রিয়তা নতুন কোনো বিষয় নয়।

তাঁর মতে, বহু পাকিস্তানি শিল্পী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হলে এবং সম্পর্ক উন্নত হলে সাংস্কৃতিক বিনিময়ও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি শিল্পীদের কনসার্টের সংখ্যা বাড়াও সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েবও প্রায় একই মত দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষ বহু দশক ধরেই পাকিস্তানি সংগীত শুনে আসছে। বিশেষ করে গজলের প্রতি বাংলাদেশের শ্রোতাদের আগ্রহ অনেক পুরোনো।

তবে আগে বিদেশি গান শোনার সুযোগ ছিল তুলনামূলক সীমিত। বেতার ও টেলিভিশন ছিল প্রধান মাধ্যম। এখন ইন্টারনেট ও অনলাইন সংগীতের বিভিন্ন মাধ্যমের কারণে তরুণরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গান নিজেরাই খুঁজে নিতে পারছেন।

ফলে কোনো দেশের গান শুনবেন, সেটি ঠিক করে দেওয়ার মতো মধ্যস্থতা এখন অনেকটাই কমে গেছে। তরুণরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান শুনছেন এবং পছন্দের শিল্পী বেছে নিচ্ছেন।

‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’ যেভাবে নতুন শ্রোতা তৈরি করেছে

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে পাকিস্তানি সংগীত জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ‘কোক স্টুডিও পাকিস্তান’-এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

লোকসংগীত, কাওয়ালি ও আধুনিক পপ সংগীতের সমন্বয়ে তৈরি গানগুলো অনলাইনে বিপুলসংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউটিউবের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি সংগীতের নতুন ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে।

একই সময়ে অনলাইন সংগীতের বিভিন্ন মাধ্যম তরুণদের জন্য বলিউডের প্রচলিত জনপ্রিয় গানের বাইরেও নতুন শিল্পী ও নতুন ধরনের সংগীত আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করেছে।

২৪ বছর বয়সী মারিন আমিন ছোটবেলা থেকেই পাকিস্তানি গান শুনছেন। ঢাকায় রাহাত ফতেহ আলী খান ও আতিফ আসলামের একাধিক কনসার্টেও অংশ নিয়েছেন তিনি।

মারিনের মতে, পাকিস্তানি সংগীতে এমন কিছু রয়েছে, যা অন্য ধরনের অনুভূতি তৈরি করে। শিল্পীরা যেভাবে গান পরিবেশন করেন, তা তাঁর কাছে খুব আকর্ষণীয়। অনেক গান শুনলে তাঁর মনে হয়, সেগুলো যেন তাঁর নিজের জীবনের গল্পই বলছে।

আর এখানেই হয়তো পাকিস্তানি গানের বড় আকর্ষণ—গান শুধু শোনা নয়, তার কথা ও আবেগের সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া।

ভারতীয় সিনেমা থেকেও পাকিস্তানি গানের পরিচিতি

বাংলাদেশি তরুণ গায়ক অ্যাঞ্জেল নূরের মতে, ভারতীয় সিনেমাও বাংলাদেশের মানুষের কাছে পাকিস্তানি গান পরিচিত করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

তবে তাঁর মতে, কোনো গান একবার শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর পর তাকে ধরে রাখে গানের মান। পাকিস্তানি গানের মান ভালো বলেই বাংলাদেশের শ্রোতারা বারবার সেসব গানে ফিরে আসছেন।

এই প্রভাব তাঁর নিজের সংগীতচর্চাতেও পড়েছে। তাঁর আসন্ন ১২টি গানের একটি অ্যালবামে পাকিস্তানি সংগীতের কিছু উপাদান রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। অ্যালবামের সংগীতায়োজনেও পাকিস্তানি শিল্পীদের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ পাকিস্তানি সংগীতের প্রভাব এখন শুধু বাংলাদেশের তরুণদের শ্রোতা হিসেবে পছন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি শিল্পীদের সৃষ্টিশীল কাজেও সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে।মাজারে গান গেয়ে তীব্র সমালোচনায় রাহাত ফতেহ আলী

সংগীতের কাছে জাতীয়তা নয়, মানটাই গুরুত্বপূর্ণ

সংগীতের ক্ষেত্রে শ্রোতারা শিল্পীর জাতীয়তার চেয়ে গানের মানকে বেশি গুরুত্ব দেন বলে মনে করেন মোহাম্মদ শোয়েব।

একজন শ্রোতা যখন কোনো গান শোনেন, তখন তিনি সবসময় ভাবেন না শিল্পী ভারতীয় না পাকিস্তানি। বরং তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সুর, কণ্ঠ, গানের কথা এবং পরিবেশনার ধরন।

পাকিস্তানি সংগীতের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই বৈশিষ্ট্যই বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এর শক্তিশালী শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছে।

ফয়সাল রব্বিকিনের মতে, পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা শুধু কয়েকজন তারকার সাফল্যের ফল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক বিনিময়, অনলাইন সংগীতের বিস্তার এবং তরুণদের পরিবর্তিত সংগীতরুচি।

তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্ম শিল্পীর পাসপোর্ট দেখে গান বেছে নেয় না। তারা গানটি ভালো কি না, সেটিই আগে দেখে।

তবে সাংস্কৃতিক বিনিময় যেন একতরফা না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি শিল্পীরা যেমন বাংলাদেশে এসে গান করছেন, তেমনি বাংলাদেশের শিল্পীদেরও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত সংগীত পরিবেশনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

বৃষ্টিভেজা কনসার্টে বদলে যাওয়া সংগীতরুচির ছবি

২৪ জুলাই মাদানী অ্যাভিনিউয়ের সেই বৃষ্টিভেজা রাত বাংলাদেশের তরুণদের সংগীতরুচির একটি পরিবর্তনকে যেন চোখের সামনে তুলে ধরেছিল।

কুমিল্লা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসা আলিফের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে যে শিল্পীর গান শুনেছেন, সেই শিল্পীকে অবশেষে নিজের চোখের সামনে গান গাইতে দেখেছেন তিনি।

অন্যদিকে মুশফিকা জাহান পরিবারের অনুমতি না পাওয়ায় কনসার্টে যেতে পারেননি। কিন্তু ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

একজন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে সরাসরি গান শুনেছেন, আরেকজন দূরে বসে পর্দার মাধ্যমে সেই মুহূর্ত অনুসরণ করেছেন। কিন্তু দুজনের অনুভূতিতে ছিল একই টান—প্রিয় সংগীতের প্রতি ভালোবাসা।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয়তা তাই শুধু একটি দেশের গান অন্য দেশের তরুণদের পছন্দ করার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনলাইন সংগীতের বিস্তার, সহজ যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, গানের মান এবং সবচেয়ে বড় কথা—শ্রোতার নিজের পছন্দ।

সীমান্ত, ভাষা কিংবা জাতীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ভালো সুর ও আবেগ যখন মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তখন সংগীতই হয়ে ওঠে দুই দেশের মানুষের মধ্যে এক নীরব সেতু।