০৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
রুশ বাহিনী এগিয়ে আসছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত ইউক্রেনের আরেক শহর ৭ কোটি বছরের পুরোনো ‘হাঙরের কবরস্থান’ আবিষ্কার মিশরের পশ্চিম মরুভূমিতে উত্তর সাইপ্রাসে ফেরি দুর্ঘটনা: মায়ের হাত ফসকে হারিয়ে গেল ১২ বছরের মেয়ে, নিখোঁজ আরও এক সন্তান খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে দিল ইরান, ছড়িয়ে পড়ল এআই-তৈরি ভিডিও ইউরোপকে বাঁচাতে শুধু বিশেষজ্ঞের টেবিল নয়, দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বন্যায় নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা শত শত শ্রমিক, চলছে প্রাণপণ উদ্ধার অভিযান লন্ডনের পতন: শত্রুর হাতে নয়, নিজের অব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ বন্যার পর চীনের কাছে আরও আগাম সতর্কতা ও তথ্য চায় নেপাল চীনের উত্থান: উন্নয়ন রাষ্ট্র থেকে সভ্যতাভিত্তিক বিশ্বদর্শনের পথে ইরানি চালকবিহীন বিমান ভূপাতিতের দাবি সংযুক্ত আরব আমিরাতের, বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা

বিদ্যুৎ সংকটে হাসপাতাল: গ্রামে চিকিৎসার শেষ ভরসাটিও কি নিভে যাচ্ছে?

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৮ দিনের হাফসা জাহানের জন্য নেবুলাইজেশন ছিল চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। কিন্তু হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসার এই সহজ অথচ জরুরি প্রক্রিয়াটিও ব্যাহত হচ্ছিল। ওয়ার্ডের পাখা বন্ধ। গরমে শিশুটির কষ্ট আরও বাড়ছিল। বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন মা কামরুন নাহার।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি সম্ভবত এখানেই—এটি শুধু ঘর অন্ধকার করছে না, হাসপাতালের চিকিৎসার সময়সূচিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় দেড় বছরের নিউমোনিয়া আক্রান্ত মোফাসসিরের দিনে ছয়বার নেবুলাইজেশন প্রয়োজন হলেও এক দিনে দেওয়া হয়েছে তিনবার। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চার বছরের মিনু আক্তারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নেবুলাইজেশন নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আসা খবরগুলো একই ধরনের একটি চিত্র সামনে আনছে—বিদ্যুৎ যখন অনিয়মিত হয়, তখন চিকিৎসার সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও ধাক্কা খায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২ আগস্ট প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালানো যায়নি। টিকিট কাউন্টারসহ বিদ্যুৎনির্ভর অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হয়।

এটি রাজধানী থেকে দূরের কোনো ছোট হাসপাতালের ঘটনা নয়। কিন্তু দেশের প্রান্তিক হাসপাতালগুলোর বাস্তবতা আরও কঠিন।বিদ্যুৎ গেলেই অন্ধকারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোগান্তিতে রোগীরা

অপারেশন থিয়েটারে কয়েক মিনিটের অন্ধকার

অস্ত্রোপচারকক্ষ এমন একটি জায়গা, যেখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কেবল অস্বস্তির বিষয় নয়—এটি চিকিৎসার নিরাপত্তার প্রশ্ন।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কথা জানা গেছে। জেনারেটর চালু করতে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার একটি সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে তালিকাভুক্ত।

নীলফামারীতেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাসেবার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যুৎ ফিরে আসা পর্যন্ত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। একই কারণে প্রতিদিনের অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও কমে যাওয়ার কথা হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এসেছে।

এখানে সংকটটি দ্বিমুখী। বিদ্যুৎ না থাকলে অস্ত্রোপচার করা কঠিন; জেনারেটর চালু করলে আবার জ্বালানি লাগে। আর জ্বালানি সংকট যখন জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেই আঘাত করছে, তখন হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটরের জন্য ডিজেল পাওয়া বা নিয়মিত কেনার সক্ষমতাও একটি আলাদা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একমাত্র জেনারেটরটি প্রায় দুই বছর ধরে একটি জোড়া ব্যাটারির অভাবে অচল। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন, প্যাথলজি ও অন্যান্য জরুরি সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি নয়। হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থায়নের দুর্বলতাও সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জাতীয় সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে গ্রাম

আগস্টে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ১০ আগস্ট পিক সময়ে লোডশেডিং প্রায় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল বলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ১৬,২৬২ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১২,৫০৫ মেগাওয়াট—অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ পূরণ করা যায়নি।

আরও সাম্প্রতিক হিসাবে, ২৮ আগস্ট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টি কেন্দ্র জ্বালানি ঘাটতি, কারিগরি সমস্যা বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে উৎপাদনের বাইরে ছিল। সেদিন দিনের বেলায় লোডশেডিং ৩,৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

এই ঘাটতির বোঝা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।

শহরের বড় হাসপাতালগুলো সাধারণত একাধিক বিদ্যুৎ সংযোগ, জেনারেটর, আইপিএস কিংবা অন্যান্য ব্যাকআপ ব্যবস্থার কিছুটা সুবিধা পায়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে একটি জেনারেটর নষ্ট, ব্যাটারি অকেজো বা ডিজেল কেনার টাকা না থাকলেই পুরো হাসপাতালের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

আগস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রাম ও মফস্বলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।  রংপুরে দিন-রাত ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর এসেছে; বরগুনায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষ বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও পর্যন্ত করেছেন।

তাই একজন শহুরে ভোক্তার কাছে দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট যে অসুবিধা, একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতালের কাছে একই সময়ের বিভ্রাট তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

কারণ সেখানে সেই দুই ঘণ্টার মধ্যে হয়তো একটি শিশুর নেবুলাইজেশন হওয়ার কথা ছিল, একজন প্রসূতির সিজার হওয়ার কথা ছিল, কোনো রোগীর এক্স-রে করার কথা ছিল কিংবা জরুরি পরীক্ষার ফল দেখে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।

বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, চিকিৎসার অবকাঠামো

হাসপাতালে বিদ্যুতের প্রয়োজনকে অনেক সময় আলো, ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর অনেক গভীরভাবে নির্ভরশীল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিদ্যুৎ হাসপাতালের আলো, যোগাযোগ ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানো, নিরাপদ প্রসব, টিকাদান, রোগ নির্ণয় এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য। প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেই নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়ার সমস্যা তুলনামূলক বেশি।

WHO, বিশ্বব্যাংক, IRENA ও Sustainable Energy for All-এর যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ এমন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন যেখানে বিদ্যুৎ নেই অথবা সরবরাহ নির্ভরযোগ্য নয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ শতাংশের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগই নেই—যদিও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ওই আঞ্চলিক গড়ের সঙ্গে সরাসরি সমান করে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেটি কি চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য?

কারণ সংযোগ থাকা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া এক বিষয় নয়।

একটি শিশুর নেবুলাইজেশন থেকে একটি অপারেশন—ক্ষতির হিসাব কোথায়?

বিদ্যুৎ সংকটে স্বাস্থ্য খাতে কতজন রোগী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব এখনো প্রকাশ্যে নেই। ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বলা কঠিন, কতটি অস্ত্রোপচার পিছিয়েছে, কতটি পরীক্ষা পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বা কতজন রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয়েছে।

কিন্তু হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমের দিকে তাকালে ক্ষতির ধরন বোঝা যায়।

প্রথম ক্ষতি চিকিৎসা বিলম্ব। নেবুলাইজেশন, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি বা ল্যাব পরীক্ষা সময়মতো না হলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দুটোই পিছিয়ে যায়।

দ্বিতীয় ক্ষতি জরুরি চিকিৎসার ঝুঁকি। অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসককে একই সঙ্গে রোগীর নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ পুনর্বহালের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হয়।

তৃতীয় ক্ষতি সেবার সক্ষমতা কমে যাওয়া। নীলফামারীর মতো হাসপাতালে যেখানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দিনে পাঁচ-ছয়টির বদলে এক-দুটি অস্ত্রোপচারে নামতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এসেছে, সেখানে হাসপাতালের কার্যকর সক্ষমতা কাগজে থাকা শয্যাসংখ্যার চেয়ে বাস্তবে কমে যায়।

চতুর্থ ক্ষতি রোগীর অতিরিক্ত ব্যয়। সরকারি উপজেলা হাসপাতালে পরীক্ষা বা চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগীকে অনেক সময় জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। যাতায়াত, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ তখন পরিবারের ওপর পড়ে।

সবশেষে রয়েছে এমন একটি ক্ষতি, যার পরিমাপ করা সবচেয়ে কঠিন—আস্থার ক্ষয়

যে মানুষটি নিজের এলাকার সরকারি হাসপাতালকে শেষ আশ্রয় মনে করেন, তিনি যখন দেখেন বিদ্যুৎ নেই, জেনারেটরে তেল নেই, পরীক্ষা হচ্ছে না বা অস্ত্রোপচার মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, তখন হাসপাতালের ওপর তার আস্থা দুর্বল হয়।দিনে ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট: জেনারেটরহীন হাসপাতালগুলোতে দুর্ভোগ চরমে

জ্বালানি সংকট হাসপাতালের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে

বর্তমান সংকটের শিকড় শুধু বিতরণ ব্যবস্থায় নয়। গ্যাসের ঘাটতি, তরল জ্বালানি ও কয়লার সরবরাহ সমস্যা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার আর্থিক চাপ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে।

এর একটি অদৃশ্য প্রতিফলন হাসপাতালেও দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে ডিজেল দরকার। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যখন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ থাকে, তখন একটি উপজেলা হাসপাতালের জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করাও প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থা অনেক জায়গায় ‘আছে’—কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সেটি ব্যবহারযোগ্য নয়।

নওগাঁর পোরশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনই একটি চিত্র পাওয়া যায়: জেনারেটর থাকলেও তেল নেই, সোলার ব্যবস্থার ব্যাটারি নষ্ট এবং আইপিএসও অকার্যকর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা আছে। জেনারেটর কেনা মানেই হাসপাতালের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়। জেনারেটরের জ্বালানি, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং প্রশিক্ষিত অপারেটর—সবকিছুর জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংকটটি কেন আরও গভীর

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ভূমিকা মৌলিক। এগুলো জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজের বিকল্প নয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের জন্য এগুলোই প্রথম বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র।

এখানে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তাই একটি হাসপাতালের সীমানায় আটকে থাকে না।

একজন প্রসূতি যদি উপজেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে না পারেন, তাকে জেলা শহরে পাঠাতে হতে পারে। একজন শিশুর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তার পরিবারকে বড় হাসপাতালে যেতে হতে পারে। কোনো রোগীর পরীক্ষা স্থানীয় হাসপাতালে না হলে তাকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রে যেতে হতে পারে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট চিকিৎসার ভৌগোলিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দিতে পারে

যার টাকা আছে, সে অন্য হাসপাতালে যাবে। যার নেই, সে অপেক্ষা করবে।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সংকট সবার জন্য একই সমস্যা তৈরি করলেও এর চিকিৎসাগত মূল্য সবার জন্য সমান নয়।

এখন প্রয়োজন ‘বিদ্যুৎ আছে কি নেই’ নয়, ‘চিকিৎসা চালু রাখার ক্ষমতা’ মাপা

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু জাতীয় গ্রিডে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে—এই হিসাব দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি বোঝা যাবে না।

প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের জন্য আলাদা করে জানা দরকার:

  • দিনে কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না;
  • সেই সময়ে কতটি অস্ত্রোপচার বা প্রসবের সেবা ব্যাহত হয়;
  • কতটি এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি ও ল্যাব পরীক্ষা পিছিয়ে যায়;
  • কতজন রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়;
  • জেনারেটর কত ঘণ্টা চালানোর মতো জ্বালানি মজুত আছে;
  • জেনারেটর, আইপিএস ও সোলার ব্যাকআপের কত শতাংশ বাস্তবে সচল;
  • এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রোগীদের অতিরিক্ত কত টাকা খরচ হচ্ছে।

এই তথ্যগুলো ছাড়া ‘হাসপাতালে বিদ্যুৎ সংকট’ কথাটি আসলে সমস্যার গভীরতা আড়াল করে।

কারণ একটি হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অর্থ শুধু কয়েক ঘণ্টা অন্ধকার নয়। তার অর্থ হতে পারে একটি পরীক্ষা পরে করা, একটি অস্ত্রোপচার স্থগিত হওয়া, একটি শিশুর চিকিৎসা কম পাওয়া কিংবা একটি পরিবারকে আরও দূরের হাসপাতালে ছুটতে হওয়া।চারদিন ধরে বিদ্যুৎ নেই চট্টগামের বিভিন্ন এলাকায় | কালবেলা

আলো ফিরলেই কি সংকট শেষ হবে?

বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হয়তো সাময়িকভাবে কমবে। গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার উৎপাদনে ফিরবে, লোডশেডিং কমে আসবে। কিন্তু গ্রামীণ হাসপাতালগুলোর দুর্বল ব্যাকআপ অবকাঠামো থেকে গেলে পরবর্তী সংকটেও একই দৃশ্য ফিরে আসবে।

তাই সমাধান শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়। হাসপাতালকে জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি আলাদা অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সোলার-প্লাস-ব্যাটারি ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জেনারেটর জ্বালানি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় ব্যাকআপ এবং জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগকে স্বাস্থ্য বাজেটের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। WHO-ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত স্থাপনযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

কারণ হাসপাতালের বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়।

এটি চিকিৎসারই অংশ।

মতলব দক্ষিণের সেই ছোট শিশুটির জন্য পাখা বন্ধ থাকা ছিল কষ্টের; নেবুলাইজেশন বন্ধ থাকা ছিল চিকিৎসার সমস্যা। কোনো অপারেশনকক্ষে আলো নিভে যাওয়া চিকিৎসকের জন্য কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক; রোগীর জন্য তা হতে পারে জীবন-মরণের ঝুঁকি।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কত মেগাওয়াট ঘাটতি হয়েছে, শুধু তা নয়।

প্রশ্ন হলো—এই ঘাটতির অন্ধকারে দেশের কতজন মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ঢাকার গ্রিডের দিকে তাকানোর পাশাপাশি তাকাতে হবে মতলব, পটিয়া, রায়পুর, বাগমারা, শাহজাদপুর, পোরশা কিংবা দেশের অন্য প্রান্তের উপজেলা হাসপাতালের দিকে।

সেখানেই বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত মানবিক মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রুশ বাহিনী এগিয়ে আসছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত ইউক্রেনের আরেক শহর

বিদ্যুৎ সংকটে হাসপাতাল: গ্রামে চিকিৎসার শেষ ভরসাটিও কি নিভে যাচ্ছে?

০৫:২৩:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৮ দিনের হাফসা জাহানের জন্য নেবুলাইজেশন ছিল চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। কিন্তু হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসার এই সহজ অথচ জরুরি প্রক্রিয়াটিও ব্যাহত হচ্ছিল। ওয়ার্ডের পাখা বন্ধ। গরমে শিশুটির কষ্ট আরও বাড়ছিল। বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন মা কামরুন নাহার।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি সম্ভবত এখানেই—এটি শুধু ঘর অন্ধকার করছে না, হাসপাতালের চিকিৎসার সময়সূচিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় দেড় বছরের নিউমোনিয়া আক্রান্ত মোফাসসিরের দিনে ছয়বার নেবুলাইজেশন প্রয়োজন হলেও এক দিনে দেওয়া হয়েছে তিনবার। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চার বছরের মিনু আক্তারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নেবুলাইজেশন নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আসা খবরগুলো একই ধরনের একটি চিত্র সামনে আনছে—বিদ্যুৎ যখন অনিয়মিত হয়, তখন চিকিৎসার সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও ধাক্কা খায়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২ আগস্ট প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালানো যায়নি। টিকিট কাউন্টারসহ বিদ্যুৎনির্ভর অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হয়।

এটি রাজধানী থেকে দূরের কোনো ছোট হাসপাতালের ঘটনা নয়। কিন্তু দেশের প্রান্তিক হাসপাতালগুলোর বাস্তবতা আরও কঠিন।বিদ্যুৎ গেলেই অন্ধকারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভোগান্তিতে রোগীরা

অপারেশন থিয়েটারে কয়েক মিনিটের অন্ধকার

অস্ত্রোপচারকক্ষ এমন একটি জায়গা, যেখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কেবল অস্বস্তির বিষয় নয়—এটি চিকিৎসার নিরাপত্তার প্রশ্ন।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কথা জানা গেছে। জেনারেটর চালু করতে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার একটি সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে তালিকাভুক্ত।

নীলফামারীতেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাসেবার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যুৎ ফিরে আসা পর্যন্ত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। একই কারণে প্রতিদিনের অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও কমে যাওয়ার কথা হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এসেছে।

এখানে সংকটটি দ্বিমুখী। বিদ্যুৎ না থাকলে অস্ত্রোপচার করা কঠিন; জেনারেটর চালু করলে আবার জ্বালানি লাগে। আর জ্বালানি সংকট যখন জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেই আঘাত করছে, তখন হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটরের জন্য ডিজেল পাওয়া বা নিয়মিত কেনার সক্ষমতাও একটি আলাদা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একমাত্র জেনারেটরটি প্রায় দুই বছর ধরে একটি জোড়া ব্যাটারির অভাবে অচল। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন, প্যাথলজি ও অন্যান্য জরুরি সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি নয়। হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থায়নের দুর্বলতাও সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জাতীয় সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে গ্রাম

আগস্টে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ১০ আগস্ট পিক সময়ে লোডশেডিং প্রায় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল বলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ১৬,২৬২ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১২,৫০৫ মেগাওয়াট—অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ পূরণ করা যায়নি।

আরও সাম্প্রতিক হিসাবে, ২৮ আগস্ট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টি কেন্দ্র জ্বালানি ঘাটতি, কারিগরি সমস্যা বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে উৎপাদনের বাইরে ছিল। সেদিন দিনের বেলায় লোডশেডিং ৩,৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

এই ঘাটতির বোঝা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।

শহরের বড় হাসপাতালগুলো সাধারণত একাধিক বিদ্যুৎ সংযোগ, জেনারেটর, আইপিএস কিংবা অন্যান্য ব্যাকআপ ব্যবস্থার কিছুটা সুবিধা পায়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে একটি জেনারেটর নষ্ট, ব্যাটারি অকেজো বা ডিজেল কেনার টাকা না থাকলেই পুরো হাসপাতালের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

আগস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রাম ও মফস্বলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।  রংপুরে দিন-রাত ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর এসেছে; বরগুনায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষ বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও পর্যন্ত করেছেন।

তাই একজন শহুরে ভোক্তার কাছে দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট যে অসুবিধা, একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতালের কাছে একই সময়ের বিভ্রাট তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

কারণ সেখানে সেই দুই ঘণ্টার মধ্যে হয়তো একটি শিশুর নেবুলাইজেশন হওয়ার কথা ছিল, একজন প্রসূতির সিজার হওয়ার কথা ছিল, কোনো রোগীর এক্স-রে করার কথা ছিল কিংবা জরুরি পরীক্ষার ফল দেখে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।

বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, চিকিৎসার অবকাঠামো

হাসপাতালে বিদ্যুতের প্রয়োজনকে অনেক সময় আলো, ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর অনেক গভীরভাবে নির্ভরশীল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিদ্যুৎ হাসপাতালের আলো, যোগাযোগ ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানো, নিরাপদ প্রসব, টিকাদান, রোগ নির্ণয় এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য। প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেই নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়ার সমস্যা তুলনামূলক বেশি।

WHO, বিশ্বব্যাংক, IRENA ও Sustainable Energy for All-এর যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ এমন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন যেখানে বিদ্যুৎ নেই অথবা সরবরাহ নির্ভরযোগ্য নয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ শতাংশের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগই নেই—যদিও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ওই আঞ্চলিক গড়ের সঙ্গে সরাসরি সমান করে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেটি কি চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য?

কারণ সংযোগ থাকা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া এক বিষয় নয়।

একটি শিশুর নেবুলাইজেশন থেকে একটি অপারেশন—ক্ষতির হিসাব কোথায়?

বিদ্যুৎ সংকটে স্বাস্থ্য খাতে কতজন রোগী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব এখনো প্রকাশ্যে নেই। ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বলা কঠিন, কতটি অস্ত্রোপচার পিছিয়েছে, কতটি পরীক্ষা পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বা কতজন রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয়েছে।

কিন্তু হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমের দিকে তাকালে ক্ষতির ধরন বোঝা যায়।

প্রথম ক্ষতি চিকিৎসা বিলম্ব। নেবুলাইজেশন, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি বা ল্যাব পরীক্ষা সময়মতো না হলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দুটোই পিছিয়ে যায়।

দ্বিতীয় ক্ষতি জরুরি চিকিৎসার ঝুঁকি। অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসককে একই সঙ্গে রোগীর নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ পুনর্বহালের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হয়।

তৃতীয় ক্ষতি সেবার সক্ষমতা কমে যাওয়া। নীলফামারীর মতো হাসপাতালে যেখানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দিনে পাঁচ-ছয়টির বদলে এক-দুটি অস্ত্রোপচারে নামতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এসেছে, সেখানে হাসপাতালের কার্যকর সক্ষমতা কাগজে থাকা শয্যাসংখ্যার চেয়ে বাস্তবে কমে যায়।

চতুর্থ ক্ষতি রোগীর অতিরিক্ত ব্যয়। সরকারি উপজেলা হাসপাতালে পরীক্ষা বা চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগীকে অনেক সময় জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। যাতায়াত, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ তখন পরিবারের ওপর পড়ে।

সবশেষে রয়েছে এমন একটি ক্ষতি, যার পরিমাপ করা সবচেয়ে কঠিন—আস্থার ক্ষয়

যে মানুষটি নিজের এলাকার সরকারি হাসপাতালকে শেষ আশ্রয় মনে করেন, তিনি যখন দেখেন বিদ্যুৎ নেই, জেনারেটরে তেল নেই, পরীক্ষা হচ্ছে না বা অস্ত্রোপচার মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, তখন হাসপাতালের ওপর তার আস্থা দুর্বল হয়।দিনে ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট: জেনারেটরহীন হাসপাতালগুলোতে দুর্ভোগ চরমে

জ্বালানি সংকট হাসপাতালের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে

বর্তমান সংকটের শিকড় শুধু বিতরণ ব্যবস্থায় নয়। গ্যাসের ঘাটতি, তরল জ্বালানি ও কয়লার সরবরাহ সমস্যা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার আর্থিক চাপ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে।

এর একটি অদৃশ্য প্রতিফলন হাসপাতালেও দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে ডিজেল দরকার। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যখন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ থাকে, তখন একটি উপজেলা হাসপাতালের জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করাও প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থা অনেক জায়গায় ‘আছে’—কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সেটি ব্যবহারযোগ্য নয়।

নওগাঁর পোরশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনই একটি চিত্র পাওয়া যায়: জেনারেটর থাকলেও তেল নেই, সোলার ব্যবস্থার ব্যাটারি নষ্ট এবং আইপিএসও অকার্যকর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা আছে। জেনারেটর কেনা মানেই হাসপাতালের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়। জেনারেটরের জ্বালানি, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং প্রশিক্ষিত অপারেটর—সবকিছুর জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংকটটি কেন আরও গভীর

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ভূমিকা মৌলিক। এগুলো জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজের বিকল্প নয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের জন্য এগুলোই প্রথম বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র।

এখানে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তাই একটি হাসপাতালের সীমানায় আটকে থাকে না।

একজন প্রসূতি যদি উপজেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে না পারেন, তাকে জেলা শহরে পাঠাতে হতে পারে। একজন শিশুর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তার পরিবারকে বড় হাসপাতালে যেতে হতে পারে। কোনো রোগীর পরীক্ষা স্থানীয় হাসপাতালে না হলে তাকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রে যেতে হতে পারে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট চিকিৎসার ভৌগোলিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দিতে পারে

যার টাকা আছে, সে অন্য হাসপাতালে যাবে। যার নেই, সে অপেক্ষা করবে।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সংকট সবার জন্য একই সমস্যা তৈরি করলেও এর চিকিৎসাগত মূল্য সবার জন্য সমান নয়।

এখন প্রয়োজন ‘বিদ্যুৎ আছে কি নেই’ নয়, ‘চিকিৎসা চালু রাখার ক্ষমতা’ মাপা

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু জাতীয় গ্রিডে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে—এই হিসাব দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি বোঝা যাবে না।

প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের জন্য আলাদা করে জানা দরকার:

  • দিনে কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না;
  • সেই সময়ে কতটি অস্ত্রোপচার বা প্রসবের সেবা ব্যাহত হয়;
  • কতটি এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি ও ল্যাব পরীক্ষা পিছিয়ে যায়;
  • কতজন রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়;
  • জেনারেটর কত ঘণ্টা চালানোর মতো জ্বালানি মজুত আছে;
  • জেনারেটর, আইপিএস ও সোলার ব্যাকআপের কত শতাংশ বাস্তবে সচল;
  • এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রোগীদের অতিরিক্ত কত টাকা খরচ হচ্ছে।

এই তথ্যগুলো ছাড়া ‘হাসপাতালে বিদ্যুৎ সংকট’ কথাটি আসলে সমস্যার গভীরতা আড়াল করে।

কারণ একটি হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অর্থ শুধু কয়েক ঘণ্টা অন্ধকার নয়। তার অর্থ হতে পারে একটি পরীক্ষা পরে করা, একটি অস্ত্রোপচার স্থগিত হওয়া, একটি শিশুর চিকিৎসা কম পাওয়া কিংবা একটি পরিবারকে আরও দূরের হাসপাতালে ছুটতে হওয়া।চারদিন ধরে বিদ্যুৎ নেই চট্টগামের বিভিন্ন এলাকায় | কালবেলা

আলো ফিরলেই কি সংকট শেষ হবে?

বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হয়তো সাময়িকভাবে কমবে। গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার উৎপাদনে ফিরবে, লোডশেডিং কমে আসবে। কিন্তু গ্রামীণ হাসপাতালগুলোর দুর্বল ব্যাকআপ অবকাঠামো থেকে গেলে পরবর্তী সংকটেও একই দৃশ্য ফিরে আসবে।

তাই সমাধান শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়। হাসপাতালকে জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি আলাদা অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সোলার-প্লাস-ব্যাটারি ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জেনারেটর জ্বালানি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্বয়ংক্রিয় ব্যাকআপ এবং জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগকে স্বাস্থ্য বাজেটের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। WHO-ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত স্থাপনযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

কারণ হাসপাতালের বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়।

এটি চিকিৎসারই অংশ।

মতলব দক্ষিণের সেই ছোট শিশুটির জন্য পাখা বন্ধ থাকা ছিল কষ্টের; নেবুলাইজেশন বন্ধ থাকা ছিল চিকিৎসার সমস্যা। কোনো অপারেশনকক্ষে আলো নিভে যাওয়া চিকিৎসকের জন্য কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক; রোগীর জন্য তা হতে পারে জীবন-মরণের ঝুঁকি।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কত মেগাওয়াট ঘাটতি হয়েছে, শুধু তা নয়।

প্রশ্ন হলো—এই ঘাটতির অন্ধকারে দেশের কতজন মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ঢাকার গ্রিডের দিকে তাকানোর পাশাপাশি তাকাতে হবে মতলব, পটিয়া, রায়পুর, বাগমারা, শাহজাদপুর, পোরশা কিংবা দেশের অন্য প্রান্তের উপজেলা হাসপাতালের দিকে।

সেখানেই বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত মানবিক মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।