০৭:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
ঢাকার বাস টার্মিনাল এখনই সরছে না, বাইরে থাকবে ডিপো—জানালেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী জাবিতে মাদককাণ্ড: দুই ছাত্রীকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার, একজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ চীনের ইভি যুদ্ধে নতুন অস্ত্র: নিজস্ব স্মার্ট-ড্রাইভিং চিপে ঝুঁকছে গাড়ি নির্মাতারা নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৬ মাস পর মুখোমুখি, জি৭ সম্মেলনে পাশাপাশি আসন জি৭ সম্মেলনে রাশিয়ার ওপর আরও চাপের সিদ্ধান্ত, ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকে ইউক্রেন ইস্যুতে নতুন বার্তা উপজেলায় এমপিদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’, প্রতিটি উপজেলায় বরাদ্দ ৬ লাখ টাকা চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের বৈঠক মুহাররমের চাঁদ দেখা যায়নি, পাকিস্তানে ২৬ জুন পালিত হবে আশুরা রয়টার্স এর প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করার প্রতিবাদ জানিয়েছে লালমনিরহাটে শিশু হত্যাকাণ্ড ঘিরে সংঘর্ষ: এসপি-ওসিসহ আহত ২০, আটক প্রধান সন্দেহভাজন

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৯৯)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ জুন ২০২৫
  • 292

নজরুল

কিন্তু কে কাহার কথা শোনে। কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। তখন আমি মরিয়া হইয়া সবাইকে শুনাইয়া বলিলাম, “আপনারা কবির কবিতা শুনছেন-এ অতি উত্তম কথা। কিন্তু কবি একটি বড় কাজে এখানে এসেছেন। আসন্ন ভোট-সংগ্রামে কবি আপনাদের সমর্থন আশা করেন। এই বিষয়ে কিছু আলোচনা করুন।”

তমিজউদ্দীন সাহেব চালাক লোক। কবিতা আবৃত্তি করিয়া কবি তাঁহার সমর্থক ও ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে কিঞ্চিৎ প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন। তিনি যে কবিকে সমর্থন করিবেন না, এমন আলোচনা তিনি তাঁহাদের সকলের সামনে করিলেন না। কবিকে তিনি আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গেলেন। পাঁচ-ছয় মিনিট পরে হাসি মুখেই তাঁহারা দুইজনে আসরে ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া কবি আবার পূর্ববৎ কবিতা আবৃত্তি করিয়া চলিলেন। আমি ভাবিলাম, কেল্লাফতে। কবির হাসিমুখ দেখিয়া এবং আবার আসিয়া তাঁহাকে কবিতা আবৃত্তি করিতে দেখিয়া ভাবিলাম, নিশ্চয়ই তমিজউদ্দীন সাহেবের দল কবিকে সমর্থন করিবে।

কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। বেলা দুইটা বাজিল। কবির সেদিকে হুঁশ নাই। কবির শ্রোতারাই এ বিষয়ে কবিকে সজাগ করিয়া দিলেন। কবি তাঁহার কাগজপত্র কুড়াইয়া লইয়া বিদায় লইলেন। তাঁহাদের ভিতর হইতে একটি লোকও বলিলেন না, এত বেলায় আপনি কোথায় যাইবেন, আমাদের এখান হইতে খাইয়া যান। আমার নিজের জেলা ফরিদপুরের এই কলঙ্ক-কথা বলিতে লজ্জায় আমার মাথা নত হইয়া পড়িতেছে। কিন্তু এ কথা না বলিলে, সেই যুগে আমাদের সমাজ এত বড় একজন কবিকে কি ভাবে অবহেলা করিতেন, তাহা জানা যাইবে না। অথচ এঁদেরই দেখিয়াছি, আলেম-সমাজের প্রতি কী গভীর শ্রদ্ধা! কত গরিব ছাত্রকে তমিজউদ্দীন সাহেব অন্নদান করিয়াছেন।

দুইটার সময় তমিজউদ্দীন সাহেবের বাড়ি হইতে বাহির হইয়া ভাবিলাম, এখন কোথায় যাই? আমার বাড়ি শহর হইতে দুই মাইলের পথ। হাঁটিয়া যাইতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগিবে। সেখানে পৌঁছিতে বেলা তিনটা বাজিবে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া আজ আর শহরে ফিরিয়া কাজকর্ম করা যাইবে না। স্থির করিলাম, বাজারে কোনো হোটেলে খাওয়া সারিয়া অন্যান্য স্থানে ভোট-সংগ্রহের কাজে মনোনিবেশ করিব।

পথে আসিতে আসিতে কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তমিজউদ্দীন সাহেবের দল আমাদের সমর্থন করবেন। এবার তবে কেল্লাফতে।”

কবি উত্তর করিলেন, “না হে, ওঁরা বাইরে ডেকে নিয়ে আমাকে আগেই বলে দিয়েছেন, আমাকে সমর্থন করবেন না। ওঁরা সমর্থন করবেন বরিশালের জমিদার ইসমাইল সাহেবকে।”

তখন রাগে দুঃখে আমার কাঁদিতে ইচ্ছা হইতেছিল। রাগ করিয়াই কবিকে বলিলাম, “আচ্ছা কবিভাই! এই যদি আপনি জানলেন, তবে এঁদের কবিতা শুনিয়ে সারাটা দিন নষ্ট করলেন কেন?”

কবি হাসিয়া বলিলেন, “ওঁরা শুনতে চাইলে, শুনিয়ে দিলুম।”

এ কথার আর কি উত্তর দিব? কবিকে লইয়া হোটেলের সন্ধানে বাহির হইলাম। তখনকার দিনে ফরিদপুর শহরে ভালো হোটেল ছিল না। যে হোটেলে যাই, দেখি মাছি ভনভন করিতেছে। ময়লা বিছানা-বালিশ হইতে নোংরা গন্ধ বাহির হইতেছে। তারই মধ্যে অপেক্ষাকৃত একটি পরিষ্কার হোটেল বাছিয়া লইয়া কোনো রকম ভোজনপর্ব সমাধা করিলাম।

চলবে…..

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার বাস টার্মিনাল এখনই সরছে না, বাইরে থাকবে ডিপো—জানালেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৯৯)

১১:০০:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ জুন ২০২৫

নজরুল

কিন্তু কে কাহার কথা শোনে। কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। তখন আমি মরিয়া হইয়া সবাইকে শুনাইয়া বলিলাম, “আপনারা কবির কবিতা শুনছেন-এ অতি উত্তম কথা। কিন্তু কবি একটি বড় কাজে এখানে এসেছেন। আসন্ন ভোট-সংগ্রামে কবি আপনাদের সমর্থন আশা করেন। এই বিষয়ে কিছু আলোচনা করুন।”

তমিজউদ্দীন সাহেব চালাক লোক। কবিতা আবৃত্তি করিয়া কবি তাঁহার সমর্থক ও ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে কিঞ্চিৎ প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন। তিনি যে কবিকে সমর্থন করিবেন না, এমন আলোচনা তিনি তাঁহাদের সকলের সামনে করিলেন না। কবিকে তিনি আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গেলেন। পাঁচ-ছয় মিনিট পরে হাসি মুখেই তাঁহারা দুইজনে আসরে ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া কবি আবার পূর্ববৎ কবিতা আবৃত্তি করিয়া চলিলেন। আমি ভাবিলাম, কেল্লাফতে। কবির হাসিমুখ দেখিয়া এবং আবার আসিয়া তাঁহাকে কবিতা আবৃত্তি করিতে দেখিয়া ভাবিলাম, নিশ্চয়ই তমিজউদ্দীন সাহেবের দল কবিকে সমর্থন করিবে।

কবি আবৃত্তি করিয়াই চলিয়াছেন। বেলা দুইটা বাজিল। কবির সেদিকে হুঁশ নাই। কবির শ্রোতারাই এ বিষয়ে কবিকে সজাগ করিয়া দিলেন। কবি তাঁহার কাগজপত্র কুড়াইয়া লইয়া বিদায় লইলেন। তাঁহাদের ভিতর হইতে একটি লোকও বলিলেন না, এত বেলায় আপনি কোথায় যাইবেন, আমাদের এখান হইতে খাইয়া যান। আমার নিজের জেলা ফরিদপুরের এই কলঙ্ক-কথা বলিতে লজ্জায় আমার মাথা নত হইয়া পড়িতেছে। কিন্তু এ কথা না বলিলে, সেই যুগে আমাদের সমাজ এত বড় একজন কবিকে কি ভাবে অবহেলা করিতেন, তাহা জানা যাইবে না। অথচ এঁদেরই দেখিয়াছি, আলেম-সমাজের প্রতি কী গভীর শ্রদ্ধা! কত গরিব ছাত্রকে তমিজউদ্দীন সাহেব অন্নদান করিয়াছেন।

দুইটার সময় তমিজউদ্দীন সাহেবের বাড়ি হইতে বাহির হইয়া ভাবিলাম, এখন কোথায় যাই? আমার বাড়ি শহর হইতে দুই মাইলের পথ। হাঁটিয়া যাইতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগিবে। সেখানে পৌঁছিতে বেলা তিনটা বাজিবে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া আজ আর শহরে ফিরিয়া কাজকর্ম করা যাইবে না। স্থির করিলাম, বাজারে কোনো হোটেলে খাওয়া সারিয়া অন্যান্য স্থানে ভোট-সংগ্রহের কাজে মনোনিবেশ করিব।

পথে আসিতে আসিতে কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তমিজউদ্দীন সাহেবের দল আমাদের সমর্থন করবেন। এবার তবে কেল্লাফতে।”

কবি উত্তর করিলেন, “না হে, ওঁরা বাইরে ডেকে নিয়ে আমাকে আগেই বলে দিয়েছেন, আমাকে সমর্থন করবেন না। ওঁরা সমর্থন করবেন বরিশালের জমিদার ইসমাইল সাহেবকে।”

তখন রাগে দুঃখে আমার কাঁদিতে ইচ্ছা হইতেছিল। রাগ করিয়াই কবিকে বলিলাম, “আচ্ছা কবিভাই! এই যদি আপনি জানলেন, তবে এঁদের কবিতা শুনিয়ে সারাটা দিন নষ্ট করলেন কেন?”

কবি হাসিয়া বলিলেন, “ওঁরা শুনতে চাইলে, শুনিয়ে দিলুম।”

এ কথার আর কি উত্তর দিব? কবিকে লইয়া হোটেলের সন্ধানে বাহির হইলাম। তখনকার দিনে ফরিদপুর শহরে ভালো হোটেল ছিল না। যে হোটেলে যাই, দেখি মাছি ভনভন করিতেছে। ময়লা বিছানা-বালিশ হইতে নোংরা গন্ধ বাহির হইতেছে। তারই মধ্যে অপেক্ষাকৃত একটি পরিষ্কার হোটেল বাছিয়া লইয়া কোনো রকম ভোজনপর্ব সমাধা করিলাম।

চলবে…..