০৩:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধের প্রভাবে আবার শক্তিশালী ডলার, নিরাপদ বিনিয়োগে ফিরে আসছে হলিউড অভিনেত্রী মেরি বেথ হার্ট আর নেই, আলঝেইমারসে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যু চীনের টেলিকম খাতে বিনিয়োগ কমছে, চাপে জেডটিই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ৪০% বৃদ্ধি, আরও বাড়ার আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ৪ ডলার ছাড়াল, চাপে ভোক্তা অর্থনীতি ইউরোপের ‘গানস বনাম বাটার’ সংকট তীব্রতর, ইরান যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি সংকটে আবারও ‘কমিউনিটি প্যান্ট্রি’ আন্দোলন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর বাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত ফের ঊর্ধ্বমুখী সোনার বাজার: ভরিতে বাড়ল ৩,২৬৬ টাকা, ২২ ক্যারেট এখন ২,৪৪,৭১১ টাকা জ্বালানি সংকটে স্কুলে হাইব্রিড ক্লাস চালুর পরিকল্পনা, ষষ্ঠ দিনও বিবেচনায়: শিক্ষামন্ত্রী

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২০৩)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ জুন ২০২৫
  • 292

নজরুল

কবি আমাকে সঙ্গে লইয়া চলিলেন তাঁর প্রকাশকের দোকানে। পথে আসিয়া কবি ট্যাক্সি ডাকিলেন। কলেজ স্ট্রীটের কাছে আসিয়া আমাকে ট্যাক্সিতে বসাইয়া কবি চলিলেন কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের দ্বিতল কক্ষে ‘আর্যস্থান পাবলিশিংহাউস-এ টাকা আনিতে। প্রায় আধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল, কবির দেখা নাই। এদিকে ট্যাক্সিতে মিটার উঠিতেছে-যত দেরি হইবে, কবিকে তত বেশি ট্যাক্সি ভাড়া দিতে হইবে। বিরক্ত হইয়া আমি উপরে উঠিয়া গেলাম। দেখি, কবি প্রকাশকের সঙ্গে একথা-ওকথা লইয়া আলাপ করিতেছেন। আসল কথা-অর্থাৎ টাকার কথা সেই গল্পের মধ্যে কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। কবির কানে কানে আমি সমঝাইয়া দিলাম, কিন্তু কবির সেদিকে খেয়াল নাই। তখন রাগত ভাবেই বলিলাম, “ওদিকে ট্যাক্সির মিটার উঠছে, সেটা মনে আছে?” কবি তখন প্রকাশকের কানে কানে টাকার কথা বলিলেন।

প্রকাশক অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া কবির হাতে পাঁচটি মাত্র টাকা দিলেন। অল্পে-তুষ্ট কবি মহাখুশি হইয়া তাহাই লইয়া গাড়িতে আসিলেন। দেখা গেল, গাড়ির মিটারে পাঁচ টাকাই উঠিয়াছে। ট্যাক্সিওয়ালাকে তাহাই দিয়া কবি পায়ে হাঁটিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেলেন।

কবিকে কত ভাবে কত জায়গায় দেখিয়াছি। যখন যেখানে তাঁহাকে দেখিয়াছি, স্ব মহিমায় তিনি সমুজ্জ্বল। বড় প্রদীপের কাছে আসিয়া ছোট প্রদীপের যে অবস্থা আমার তাহাই হইত। অথচ পরের গুণপনাকে এমন অকুন্ঠ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করিতে নজরুলের মতো আর কাহাকেও দেখি নাই। অপর কাহারও প্রশংসা করিতে পারিলে তিনি যেন কৃতার্থ হইয়া যাইতেন। অপরকে হেয় করিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে তিনি কোনোদিনই প্রয়াস পান নাই। কবি যখন গানের আসরে আসিয়া বসিয়াছেন, সেখানে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ক। সকলেই তাঁর গান শুনিতে চাহিতেন।

হয়তো বা সেই সভায় কবির চাইতেও অনেক সুকণ্ঠ গায়ক বর্তমান। তেমনি গল্পের আসরে, সাহিত্যের মজলিশে, রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চে-সব জায়গায় সেই একই অবস্থা। ইহার একমাত্র কারণ স্বাভাবিক গুণপনা তো কবির ছিলই, তার সঙ্গে ছিল তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের কাছে স্বেচ্ছায় সকলে নত হইয়া পড়িত। তবু এই লোকের শত্রুর অন্ত ছিল না। কবির দেশ-জোড়া প্রশংসা শুনিয়া তাহারা ঈর্যায় জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিত। কাগজে নানারূপ ব্যঙ্গরচনা করিয়া তাহারা কবিকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা পাইত। কবি প্রায়ই সেদিকে খেয়াল করিতেন না। যদিই বা তাহাদের কামড়ে উত্যক্ত হইয়া কখনো কখনো দু-একটি বাক্যবাণ ছুঁড়িয়াছেন, কবির রচনার জাদুস্পর্শে তাহা বাংলা-সাহিত্যে অমর হইয়া আছে।

নজরুলের জীবন লইয়া অনেক চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি। এই লোকটি আশ্চর্য লোকরঞ্জনের ক্ষমতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। যখনই যেখানে গিয়াছেন, যশ অর্থ সম্মান আপনা হইতেই আসিয়া তাঁহার পদতলে লুটাইয়া পড়িয়াছে। রবীন্দ্রনাথ হইতে সত্যেন্দ্রনাথ পর্যন্ত-কেহই কবিতা রচনা করিয়া সেকালে অর্থ-উপার্জন করিতে পারেন নাই। রবীন্দ্রনাথের বহু পুস্তকের তখন দ্বিতীয় সংস্করণ হইত না। মাসিক পত্রিকার সম্পাদক কবিদের কবিতার জন্য অর্থ তো দিতেনই না-যে সংখ্যায় কবির কবিতা ছাপা হইত সেই সংখ্যাটি পর্যন্ত কবিকে কিনিয়া লইতে হইত। নজরুলই বোধ হয় বাংলার প্রথম কবি, যিনি কবিতা লিখিয়া মাসিক পত্রিকা হইতেও প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়াছেন।

আগে গ্রামোফোনের জন্য যাঁহারা গান রচনা করিতেন, গ্রামোফোন কোম্পানির নিকট হইতে তাঁহাদের খুব কম লোকই রচনার মূল্য আদায় করিতে পারিতেন। নজরুল গ্রামোফোনের গান রচনা করিয়া শুধু নিজের গানের জন্যই পারিশ্রমিক আদায় করিলেন না; তাঁহার আগমনের পর হইতে সকল লেখকই রচনার গন্য গ্রামোফোন কোম্পানি হইতে উপযুক্ত মূল্য পাইতে লাগিলেন। নজরুল প্রমাণ করিলেন, গানের রেকর্ড যে বেশি বিক্রয় হয়, সে শুধু গায়কদের সুকণ্ঠের জন্যই নয়, সুন্দর রচনার সহিত সুন্দর সুরের সমাবেশ রেকর্ড বিক্রয় বাড়াইয়া দেয়।

চলবে…..

যুদ্ধের প্রভাবে আবার শক্তিশালী ডলার, নিরাপদ বিনিয়োগে ফিরে আসছে

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২০৩)

১১:০০:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ জুন ২০২৫

নজরুল

কবি আমাকে সঙ্গে লইয়া চলিলেন তাঁর প্রকাশকের দোকানে। পথে আসিয়া কবি ট্যাক্সি ডাকিলেন। কলেজ স্ট্রীটের কাছে আসিয়া আমাকে ট্যাক্সিতে বসাইয়া কবি চলিলেন কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের দ্বিতল কক্ষে ‘আর্যস্থান পাবলিশিংহাউস-এ টাকা আনিতে। প্রায় আধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল, কবির দেখা নাই। এদিকে ট্যাক্সিতে মিটার উঠিতেছে-যত দেরি হইবে, কবিকে তত বেশি ট্যাক্সি ভাড়া দিতে হইবে। বিরক্ত হইয়া আমি উপরে উঠিয়া গেলাম। দেখি, কবি প্রকাশকের সঙ্গে একথা-ওকথা লইয়া আলাপ করিতেছেন। আসল কথা-অর্থাৎ টাকার কথা সেই গল্পের মধ্যে কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। কবির কানে কানে আমি সমঝাইয়া দিলাম, কিন্তু কবির সেদিকে খেয়াল নাই। তখন রাগত ভাবেই বলিলাম, “ওদিকে ট্যাক্সির মিটার উঠছে, সেটা মনে আছে?” কবি তখন প্রকাশকের কানে কানে টাকার কথা বলিলেন।

প্রকাশক অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া কবির হাতে পাঁচটি মাত্র টাকা দিলেন। অল্পে-তুষ্ট কবি মহাখুশি হইয়া তাহাই লইয়া গাড়িতে আসিলেন। দেখা গেল, গাড়ির মিটারে পাঁচ টাকাই উঠিয়াছে। ট্যাক্সিওয়ালাকে তাহাই দিয়া কবি পায়ে হাঁটিয়া বাড়ি ফিরিয়া গেলেন।

কবিকে কত ভাবে কত জায়গায় দেখিয়াছি। যখন যেখানে তাঁহাকে দেখিয়াছি, স্ব মহিমায় তিনি সমুজ্জ্বল। বড় প্রদীপের কাছে আসিয়া ছোট প্রদীপের যে অবস্থা আমার তাহাই হইত। অথচ পরের গুণপনাকে এমন অকুন্ঠ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করিতে নজরুলের মতো আর কাহাকেও দেখি নাই। অপর কাহারও প্রশংসা করিতে পারিলে তিনি যেন কৃতার্থ হইয়া যাইতেন। অপরকে হেয় করিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে তিনি কোনোদিনই প্রয়াস পান নাই। কবি যখন গানের আসরে আসিয়া বসিয়াছেন, সেখানে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ক। সকলেই তাঁর গান শুনিতে চাহিতেন।

হয়তো বা সেই সভায় কবির চাইতেও অনেক সুকণ্ঠ গায়ক বর্তমান। তেমনি গল্পের আসরে, সাহিত্যের মজলিশে, রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চে-সব জায়গায় সেই একই অবস্থা। ইহার একমাত্র কারণ স্বাভাবিক গুণপনা তো কবির ছিলই, তার সঙ্গে ছিল তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের কাছে স্বেচ্ছায় সকলে নত হইয়া পড়িত। তবু এই লোকের শত্রুর অন্ত ছিল না। কবির দেশ-জোড়া প্রশংসা শুনিয়া তাহারা ঈর্যায় জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিত। কাগজে নানারূপ ব্যঙ্গরচনা করিয়া তাহারা কবিকে হেয় প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা পাইত। কবি প্রায়ই সেদিকে খেয়াল করিতেন না। যদিই বা তাহাদের কামড়ে উত্যক্ত হইয়া কখনো কখনো দু-একটি বাক্যবাণ ছুঁড়িয়াছেন, কবির রচনার জাদুস্পর্শে তাহা বাংলা-সাহিত্যে অমর হইয়া আছে।

নজরুলের জীবন লইয়া অনেক চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি। এই লোকটি আশ্চর্য লোকরঞ্জনের ক্ষমতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। যখনই যেখানে গিয়াছেন, যশ অর্থ সম্মান আপনা হইতেই আসিয়া তাঁহার পদতলে লুটাইয়া পড়িয়াছে। রবীন্দ্রনাথ হইতে সত্যেন্দ্রনাথ পর্যন্ত-কেহই কবিতা রচনা করিয়া সেকালে অর্থ-উপার্জন করিতে পারেন নাই। রবীন্দ্রনাথের বহু পুস্তকের তখন দ্বিতীয় সংস্করণ হইত না। মাসিক পত্রিকার সম্পাদক কবিদের কবিতার জন্য অর্থ তো দিতেনই না-যে সংখ্যায় কবির কবিতা ছাপা হইত সেই সংখ্যাটি পর্যন্ত কবিকে কিনিয়া লইতে হইত। নজরুলই বোধ হয় বাংলার প্রথম কবি, যিনি কবিতা লিখিয়া মাসিক পত্রিকা হইতেও প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়াছেন।

আগে গ্রামোফোনের জন্য যাঁহারা গান রচনা করিতেন, গ্রামোফোন কোম্পানির নিকট হইতে তাঁহাদের খুব কম লোকই রচনার মূল্য আদায় করিতে পারিতেন। নজরুল গ্রামোফোনের গান রচনা করিয়া শুধু নিজের গানের জন্যই পারিশ্রমিক আদায় করিলেন না; তাঁহার আগমনের পর হইতে সকল লেখকই রচনার গন্য গ্রামোফোন কোম্পানি হইতে উপযুক্ত মূল্য পাইতে লাগিলেন। নজরুল প্রমাণ করিলেন, গানের রেকর্ড যে বেশি বিক্রয় হয়, সে শুধু গায়কদের সুকণ্ঠের জন্যই নয়, সুন্দর রচনার সহিত সুন্দর সুরের সমাবেশ রেকর্ড বিক্রয় বাড়াইয়া দেয়।

চলবে…..