০৫:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
ট্রাম্প বললেন ভেনেজুয়েলার আকাশপথ ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত জিন্নাহর ফেডারেল কোর্ট ছিল এক সেতু: ২৭তম সংশোধনী সেই সেতুটি পুড়িয়ে দিল পাকিস্তানে রাজনৈতিক বন্দিদের সাক্ষাৎ–বিতর্ক: কারাবিধি আসলে কী বলে আমেরিকায় লেফটোভার বিপ্লব: মুদ্রাস্ফীতির চাপে রান্নাঘরে ফিরে আসছে সৃজনশীলতা ওয়াশিংটন হত্যাকাণ্ডের পর ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন দমন: ‘রিভার্স মাইগ্রেশন’ এখন প্রশাসনের অগ্রাধিকার ইসরায়েলের সতর্কতা: ইরানের সঙ্গে আরেক দফা যুদ্ধ কি সামনে দাঁড়িয়ে? ইরানের নতুন বার্তা: পরমাণু আলোচনায় ফেরার বিরল সুযোগ এখনই ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়ে উদ্বেগে অরিগনের উপকূলীয় মাছধরা শহর কাবুলের ইন্টারকনটিনেন্টাল: জাঁকজমক, যুদ্ধ আর মানুষের ভূতের মতো স্মৃতি সামুদ্রিক ফাঁদ টেনে তুলে নিল নেকড়ে: মানুষের রেখে যাওয়া ‘যন্ত্র’ ব্যবহার করে অবাক আচরণ

কীভাবে ২০২৫ সালে ইন্টারনেট জয় করল ইন্দোনেশিয়া

ভাইরাল দুটি মুহূর্ত
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার দুটি ভাইরাল মুহূর্ত বিশ্বের জনপ্রিয় সংস্কৃতির মানচিত্রে এক নতুন দিক নির্দেশ করেছে।
প্রথমটি ছিল „টুং টুং টুং সেহরি‟—রমজান মাসে ভোরের খাবারের ডাক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত কাঠের ঢাকের এক ব্যঙ্গচিত্র। এটি প্রথম দেখা দেয় টিকটকে, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে ইতালীয় ‘ব্রেনরট’ মিম জগতে। কানাডীয় গ্রাফিক আর্টিস্ট মার্ক কানাতারো তৈরি ভিডিও প্রায় অর্ধশত কোটি বার দেখা হয়েছে। এর জনপ্রিয়তা এতটাই যে এর ওপর ভিত্তি করে অ্যানিমে ধাঁচের মিউজিক ভিডিও তৈরি হয়েছে, যেটি মাত্র তিন মাসে ৮ কোটি ভিউ ছাড়িয়েছে। ডাচ ডিজে জুটি W&W সেই সুরকে রিমিক্স করে কোটি ভক্তের মন জয় করেছে।

দ্বিতীয় মুহূর্তটি আসে জুলাইয়ে। রিয়াউ প্রদেশের এক নৌকা দৌড়ে ১১ বছরের রায়ান আরকান দিখা ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার চটপটে নাচের ভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে আলো কাড়ে। সোশ্যাল মিডিয়া তাকে মুকুট পরায় “অরা ফার্মিং”-এর মাস্টার হিসেবে। অর্থাৎ, নিজেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষমতা।

মিম থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তার
„টুং টুং টুং সেহরি‟ চরিত্রটি ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে টিকটক নির্মাতা @noxaasht প্রথম এআই-সৃষ্ট রূপে প্রকাশ করেছিলেন। তারপর থেকে এটি প্লাশ টয়, ফিগারিনসহ নানা সামগ্রীতে রূপ নিয়েছে, যা এখন সিঙ্গাপুর, টোকিও থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি অনলাইন মার্কেটপ্লেস এটসিতেও এর বাজার মিলেছে।

অন্যদিকে রায়ানের নাচ অনুকরণ করেছেন এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি থেকে শুরু করে থাই-ব্রিটিশ এফ১ চালক অ্যালেক্স আলবন পর্যন্ত। সিঙ্গাপুর নৌবাহিনীও নিজেদের টিকটক সংস্করণ প্রকাশ করেছে। হাজারো সাধারণ মানুষ কালো সানগ্লাস পরে ইন্দোনেশীয় সুরে নাচের ভিডিও বানিয়ে এই ঢেউয়ে যোগ দিয়েছে।

জাতীয় গর্বের প্রতীক
এ ঘটনাগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত, কোনো রেকর্ড লেবেল বা সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় হয়নি। তবুও এগুলো ইন্দোনেশিয়ার মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে জাতীয় গর্বে। অনেকে Redditে জানিয়েছেন, এগুলো অসম্মানজনক নয়, বরং আনন্দদায়ক। কারও মতে, এগুলো ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

“অরা ফার্মিং” নাচ এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ১৭ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও তাল মিলিয়েছিলেন।

বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও পর্যটনের উত্থান
একসময় ভোরের নিস্তব্ধ পাড়ায় শোনা সেহরির ডাক এখন কোটি মানুষের কাছে পরিচিত। একইভাবে স্থানীয় নৌকা দৌড় বিশ্বের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে।
পর্যটন খাতও এর সুফল পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রিয়াউয়ের পাকু জলুর উৎসবে পর্যটক সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। সরকার এই প্রতিযোগিতাকে ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উত্থান
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫,০৪ শতাংশ, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি। অর্থনীতির এই আত্মবিশ্বাসই প্রতিফলিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। এ ধরনের ভাইরাল মুহূর্ত দেখাচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীত, রসবোধ ও ভঙ্গিমা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে।

বহু-মেরুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বিশ্ব
আজকের ডিজিটাল যুগে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাব আর কেবল পশ্চিমা সিনেমা, সিরিজ বা পপ সঙ্গীতে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যালগরিদমের কারণে একটি গ্রামের গান বা নৌকা দৌড়ও ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।

আজ সাংস্কৃতিক প্রভাব আসছে সিউলের কে-ড্রামা, জাপানের অ্যানিমে, লাগোসের আফ্রোবিটস কিংবা রিয়াউয়ের “অরা ফার্মিং” থেকে।

ইন্দোনেশিয়ার এসব স্বতঃস্ফূর্ত রপ্তানি দেখিয়ে দিয়েছে যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর কেবল বৈশ্বিক সংস্কৃতি ভোগ করছে না, বরং সেটি গড়ে তুলছে। এখন প্রভাব কেবল পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হচ্ছে না—এটি পারস্পরিক, স্তরবিন্যস্ত ও চমকপ্রদ। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া শুধু দর্শক নয়, বরং নিজেও এখন বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্প বললেন ভেনেজুয়েলার আকাশপথ ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত

কীভাবে ২০২৫ সালে ইন্টারনেট জয় করল ইন্দোনেশিয়া

০১:২৩:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫

ভাইরাল দুটি মুহূর্ত
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার দুটি ভাইরাল মুহূর্ত বিশ্বের জনপ্রিয় সংস্কৃতির মানচিত্রে এক নতুন দিক নির্দেশ করেছে।
প্রথমটি ছিল „টুং টুং টুং সেহরি‟—রমজান মাসে ভোরের খাবারের ডাক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত কাঠের ঢাকের এক ব্যঙ্গচিত্র। এটি প্রথম দেখা দেয় টিকটকে, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে ইতালীয় ‘ব্রেনরট’ মিম জগতে। কানাডীয় গ্রাফিক আর্টিস্ট মার্ক কানাতারো তৈরি ভিডিও প্রায় অর্ধশত কোটি বার দেখা হয়েছে। এর জনপ্রিয়তা এতটাই যে এর ওপর ভিত্তি করে অ্যানিমে ধাঁচের মিউজিক ভিডিও তৈরি হয়েছে, যেটি মাত্র তিন মাসে ৮ কোটি ভিউ ছাড়িয়েছে। ডাচ ডিজে জুটি W&W সেই সুরকে রিমিক্স করে কোটি ভক্তের মন জয় করেছে।

দ্বিতীয় মুহূর্তটি আসে জুলাইয়ে। রিয়াউ প্রদেশের এক নৌকা দৌড়ে ১১ বছরের রায়ান আরকান দিখা ঢেউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার চটপটে নাচের ভঙ্গিতে বিশ্বজুড়ে আলো কাড়ে। সোশ্যাল মিডিয়া তাকে মুকুট পরায় “অরা ফার্মিং”-এর মাস্টার হিসেবে। অর্থাৎ, নিজেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষমতা।

মিম থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তার
„টুং টুং টুং সেহরি‟ চরিত্রটি ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে টিকটক নির্মাতা @noxaasht প্রথম এআই-সৃষ্ট রূপে প্রকাশ করেছিলেন। তারপর থেকে এটি প্লাশ টয়, ফিগারিনসহ নানা সামগ্রীতে রূপ নিয়েছে, যা এখন সিঙ্গাপুর, টোকিও থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি অনলাইন মার্কেটপ্লেস এটসিতেও এর বাজার মিলেছে।

অন্যদিকে রায়ানের নাচ অনুকরণ করেছেন এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি থেকে শুরু করে থাই-ব্রিটিশ এফ১ চালক অ্যালেক্স আলবন পর্যন্ত। সিঙ্গাপুর নৌবাহিনীও নিজেদের টিকটক সংস্করণ প্রকাশ করেছে। হাজারো সাধারণ মানুষ কালো সানগ্লাস পরে ইন্দোনেশীয় সুরে নাচের ভিডিও বানিয়ে এই ঢেউয়ে যোগ দিয়েছে।

জাতীয় গর্বের প্রতীক
এ ঘটনাগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত, কোনো রেকর্ড লেবেল বা সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় হয়নি। তবুও এগুলো ইন্দোনেশিয়ার মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে জাতীয় গর্বে। অনেকে Redditে জানিয়েছেন, এগুলো অসম্মানজনক নয়, বরং আনন্দদায়ক। কারও মতে, এগুলো ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

“অরা ফার্মিং” নাচ এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ১৭ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও তাল মিলিয়েছিলেন।

বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও পর্যটনের উত্থান
একসময় ভোরের নিস্তব্ধ পাড়ায় শোনা সেহরির ডাক এখন কোটি মানুষের কাছে পরিচিত। একইভাবে স্থানীয় নৌকা দৌড় বিশ্বের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে।
পর্যটন খাতও এর সুফল পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রিয়াউয়ের পাকু জলুর উৎসবে পর্যটক সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। সরকার এই প্রতিযোগিতাকে ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উত্থান
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫,০৪ শতাংশ, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি। অর্থনীতির এই আত্মবিশ্বাসই প্রতিফলিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। এ ধরনের ভাইরাল মুহূর্ত দেখাচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীত, রসবোধ ও ভঙ্গিমা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে।

বহু-মেরুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বিশ্ব
আজকের ডিজিটাল যুগে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাব আর কেবল পশ্চিমা সিনেমা, সিরিজ বা পপ সঙ্গীতে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যালগরিদমের কারণে একটি গ্রামের গান বা নৌকা দৌড়ও ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে।

আজ সাংস্কৃতিক প্রভাব আসছে সিউলের কে-ড্রামা, জাপানের অ্যানিমে, লাগোসের আফ্রোবিটস কিংবা রিয়াউয়ের “অরা ফার্মিং” থেকে।

ইন্দোনেশিয়ার এসব স্বতঃস্ফূর্ত রপ্তানি দেখিয়ে দিয়েছে যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর কেবল বৈশ্বিক সংস্কৃতি ভোগ করছে না, বরং সেটি গড়ে তুলছে। এখন প্রভাব কেবল পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হচ্ছে না—এটি পারস্পরিক, স্তরবিন্যস্ত ও চমকপ্রদ। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া শুধু দর্শক নয়, বরং নিজেও এখন বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।