০৮:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধের মাঝেই বদলে গেছে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র, শক্তিশালী হচ্ছে বিপ্লবী গার্ড সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি নির্বাচন: মনোনয়ন বাতিলে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের অংশগ্রহণে বাধা ঢাকায় ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার তলব, আসাম মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি মে দিবসে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি জি এম কাদেরের জম্মু থেকে শ্রীনগর মাত্র ৫ ঘণ্টায়: ভন্দে ভারত এক্সপ্রেসের নতুন যুগের সূচনা তেল ও গ্যাস সংকট ২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে ইরান যুদ্ধ ও এল নিনোর চাপে বৈশ্বিক চাল বাজারে সংকটের আশঙ্কা বিএনপি সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে পারবে? পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি হেপাটাইটিস সি রোগী, বিশ্বজুড়ে নতুন সতর্কবার্তা ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে, হাসপাতালে চাপ—সতর্কতায় জোর

হাওরের পানিতে ডুবছে বর্গাচাষীর স্বপ্ন: ঋণ, চুক্তি আর জীবিকার ত্রিমুখী সংকট

হাওরের বোরো ফসল ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়েছে বর্গাচাষীদের ওপর। সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। এই বিপর্যয়ে শুধু ফসলই হারায়নি, ভেঙে পড়েছে বর্গাচাষীদের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো। সারাক্ষণ রিপোর্ট

চুক্তির ফাঁদে বন্দি বর্গাচাষী

বর্গাচাষীরা সাধারণত জমির মালিকের সঙ্গে ভাগাভাগির চুক্তিতে চাষ করেন। ফসল ঘরে তোলার পর নির্দিষ্ট অংশ মালিককে দিতে হয়। কিন্তু এবার ফসলই যখন নেই, তখন চুক্তির দায় থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই তাদের সামনে। ফলে উৎপাদন না থাকলেও চুক্তির চাপ থেকে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের একাধিক কৃষকের মতো অনেকেই জানান, তারা ঋণ নিয়ে জমি আবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে একদিকে জমির মালিককে অংশ দেওয়া, অন্যদিকে ঋণ শোধ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন তারা।

ঋণ ও বেঁচে থাকার লড়াই

এই অঞ্চলের বেশিরভাগ বর্গাচাষী ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করেন। ফসল বিক্রির টাকাই তাদের ঋণ পরিশোধ ও সারা বছরের খরচের প্রধান উৎস। কিন্তু এবার সেই চক্র ভেঙে গেছে।

একজন কৃষকের ভাষায়, দুশ্চিন্তা এখন তিনটি—চুক্তির ধান দেওয়া, ঋণ শোধ করা এবং পরিবারের খরচ চালানো। এই তিন সংকট একসঙ্গে এসে বর্গাচাষীদের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

হাওরে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক - বাংলাবাজার  পত্রিকা.কম

ফসলহানি: পরিসংখ্যানের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়

সরকারি হিসাবে প্রায় ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার টন ধান। অর্থমূল্যে তা প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে বাস্তবে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন হাওরে দেখা গেছে, অনেক কৃষক আধা-পাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন। কোথাও শ্রমিক সংকট, কোথাও জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা। ফলে একদিকে ফসল নষ্ট, অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ।

কাঠামোগত দুর্বলতা: বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ও শ্রমিক সংকট

এই সংকটের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, রয়েছে অব্যবস্থাপনাও। অনেক কৃষকের অভিযোগ, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ঠিকমতো কাজ করেনি। কোথাও কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে না পেরে জমে গিয়ে ফসল ডুবিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট। সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই ধান কাটতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত যখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তখন আর কিছুই করার ছিল না।

বর্গাচাষীর ভবিষ্যৎ কোথায়

এই পরিস্থিতি বর্গাচাষীদের জন্য শুধু একটি মৌসুমি ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ফাঁদ তৈরি করছে। ফসল হারানো মানে শুধু এক বছরের আয় হারানো নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ঋণ, সুদের চাপ এবং খাদ্য নিরাপত্তার সংকট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জরুরি সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল এবং কৃষি সহায়তা কার্যক্রম না বাড়ানো হয়, তাহলে এই বর্গাচাষীদের বড় একটি অংশ আগামী মৌসুমে চাষেই ফিরতে পারবে না।

মানবিক সংকটের গভীরতা

হাওরের কৃষকদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—কীভাবে চলবে আগামী বছর? অনেকেই বলছেন, বোরো ফসলই তাদের একমাত্র ভরসা ছিল। সেই ভরসা ডুবে যাওয়ায় তাদের জীবনের ভিত্তিই নড়ে গেছে।

এই সংকট তাই শুধু কৃষি খাতের নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় একটি সতর্ক সংকেত। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে বর্গাচাষীরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।

যুদ্ধের মাঝেই বদলে গেছে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র, শক্তিশালী হচ্ছে বিপ্লবী গার্ড

হাওরের পানিতে ডুবছে বর্গাচাষীর স্বপ্ন: ঋণ, চুক্তি আর জীবিকার ত্রিমুখী সংকট

০৬:৩৫:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

হাওরের বোরো ফসল ডুবে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়েছে বর্গাচাষীদের ওপর। সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। এই বিপর্যয়ে শুধু ফসলই হারায়নি, ভেঙে পড়েছে বর্গাচাষীদের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো। সারাক্ষণ রিপোর্ট

চুক্তির ফাঁদে বন্দি বর্গাচাষী

বর্গাচাষীরা সাধারণত জমির মালিকের সঙ্গে ভাগাভাগির চুক্তিতে চাষ করেন। ফসল ঘরে তোলার পর নির্দিষ্ট অংশ মালিককে দিতে হয়। কিন্তু এবার ফসলই যখন নেই, তখন চুক্তির দায় থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই তাদের সামনে। ফলে উৎপাদন না থাকলেও চুক্তির চাপ থেকে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের একাধিক কৃষকের মতো অনেকেই জানান, তারা ঋণ নিয়ে জমি আবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে একদিকে জমির মালিককে অংশ দেওয়া, অন্যদিকে ঋণ শোধ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন তারা।

ঋণ ও বেঁচে থাকার লড়াই

এই অঞ্চলের বেশিরভাগ বর্গাচাষী ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করেন। ফসল বিক্রির টাকাই তাদের ঋণ পরিশোধ ও সারা বছরের খরচের প্রধান উৎস। কিন্তু এবার সেই চক্র ভেঙে গেছে।

একজন কৃষকের ভাষায়, দুশ্চিন্তা এখন তিনটি—চুক্তির ধান দেওয়া, ঋণ শোধ করা এবং পরিবারের খরচ চালানো। এই তিন সংকট একসঙ্গে এসে বর্গাচাষীদের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

হাওরে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক - বাংলাবাজার  পত্রিকা.কম

ফসলহানি: পরিসংখ্যানের আড়ালে মানবিক বিপর্যয়

সরকারি হিসাবে প্রায় ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার টন ধান। অর্থমূল্যে তা প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে বাস্তবে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন হাওরে দেখা গেছে, অনেক কৃষক আধা-পাকা ধান কাটতে বাধ্য হয়েছেন। কোথাও শ্রমিক সংকট, কোথাও জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা। ফলে একদিকে ফসল নষ্ট, অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ।

কাঠামোগত দুর্বলতা: বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ও শ্রমিক সংকট

এই সংকটের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, রয়েছে অব্যবস্থাপনাও। অনেক কৃষকের অভিযোগ, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ঠিকমতো কাজ করেনি। কোথাও কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে না পেরে জমে গিয়ে ফসল ডুবিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট। সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই ধান কাটতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত যখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তখন আর কিছুই করার ছিল না।

বর্গাচাষীর ভবিষ্যৎ কোথায়

এই পরিস্থিতি বর্গাচাষীদের জন্য শুধু একটি মৌসুমি ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের ফাঁদ তৈরি করছে। ফসল হারানো মানে শুধু এক বছরের আয় হারানো নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ঋণ, সুদের চাপ এবং খাদ্য নিরাপত্তার সংকট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জরুরি সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল এবং কৃষি সহায়তা কার্যক্রম না বাড়ানো হয়, তাহলে এই বর্গাচাষীদের বড় একটি অংশ আগামী মৌসুমে চাষেই ফিরতে পারবে না।

মানবিক সংকটের গভীরতা

হাওরের কৃষকদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—কীভাবে চলবে আগামী বছর? অনেকেই বলছেন, বোরো ফসলই তাদের একমাত্র ভরসা ছিল। সেই ভরসা ডুবে যাওয়ায় তাদের জীবনের ভিত্তিই নড়ে গেছে।

এই সংকট তাই শুধু কৃষি খাতের নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় একটি সতর্ক সংকেত। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে বর্গাচাষীরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।