০৩:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
হামে ভয়াবহতা বাড়ছেই, আরও ১০ শিশুর মৃত্যু যুদ্ধ যখন যন্ত্রের গতিতে, রাজনীতি কি তখনও মানুষের থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ হওয়ার অর্থ কী ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’: যে কাব্য বাঁচিয়ে রেখেছে পারস্যের আত্মা গার্দিওলার বিদায় মঞ্চে মাইকেল জর্ডানের আবেগঘন বার্তা, কেঁদে ফেললেন ম্যানসিটি কোচ চীনের মহাকাশে ইতিহাস, প্রথমবারের মতো হংকংয়ের নারী নভোচারীর যাত্রা আফগানিস্তানে মেয়েদের স্বপ্ন এখন বিয়ের খাঁচায় বন্দি সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০: স্বপ্নের মেগা প্রকল্পে ধাক্কা, বাস্তবতার মুখে নতুন হিসাব ৪৫০ টাকার বিরোধে বন্ধুর ছুরিকাঘাতে তরুণ নিহত, রাজশাহীতে চাঞ্চল্য আফগানিস্তানে মেয়েদের স্বপ্ন থামিয়ে দিচ্ছে বাল্যবিয়ে, বন্ধ স্কুলে বাড়ছে হতাশা

ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’: যে কাব্য বাঁচিয়ে রেখেছে পারস্যের আত্মা

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে কিছু সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একটি জাতির অস্তিত্ব, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’ ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মহাকাব্য পারস্য জাতির ইতিহাস, বীরত্ব, ট্র্যাজেডি, প্রেম, যুদ্ধ এবং আত্মপরিচয়ের ধারক হিসেবে টিকে আছে। আর এই মহাকাব্যের রচয়িতা আবুল কাসেম ফেরদৌসি শুধু একজন কবি নন, তাঁকে মনে করা হয় পারস্য ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম মহান রক্ষক।

এক অস্থির সময়ে জন্ম নেওয়া এক কবি

ফেরদৌসির জন্ম হয়েছিল খোরাসানের তুস নগরে, আনুমানিক ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় পারস্য অঞ্চল আরব মুসলিম শাসনের অধীনে। ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষা প্রশাসন, জ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যের প্রধান ভাষায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে পারস্যের বহু প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

তবে পারস্যের মানুষ নিজেদের ইতিহাস ভুলে যেতে রাজি ছিল না। পুরনো রাজাদের গল্প, বীরদের কাহিনি এবং পৌরাণিক কিংবদন্তি লোকমুখে বেঁচে ছিল। ফেরদৌসি বুঝতে পেরেছিলেন, এই গল্পগুলো সংরক্ষণ না করা গেলে একদিন পুরো একটি সভ্যতার স্মৃতি মুছে যাবে। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ—‘শাহনামা’ রচনা।

Shāh-nāmeh | Persian Epic, Epic Poem, Epic Poetry | Britannica

ত্রিশ বছরের সাধনা

‘শাহনামা’ লেখা ছিল কোনো সাধারণ সাহিত্যকর্ম নয়। ফেরদৌসি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মহাকাব্য রচনা করেন। তিনি পুরনো পাণ্ডুলিপি, রাজদরবারের ইতিহাস, লোককাহিনি এবং প্রাচীন পারস্যের মৌখিক ঐতিহ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর আগে দাকিকি নামে আরেক কবি এই কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু অসময়ে নিহত হওয়ায় কাজ শেষ করতে পারেননি। ফেরদৌসি পরে সেই অসমাপ্ত প্রচেষ্টাকেও নিজের কাব্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।

মোট প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার দ্বিপদী নিয়ে গড়ে ওঠা ‘শাহনামা’ বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্যগুলোর একটি। তুলনামূলকভাবে বলা হয়, হোমারের ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’ মিলিয়েও এর চেয়ে ছোট।

ফেরদৌসি এই কাব্য মূলত বিশুদ্ধ পারসি ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছিলেন। আরবি শব্দের ব্যবহার তিনি খুব সীমিত রাখেন। ফলে ‘শাহনামা’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, পারসি ভাষাকে টিকিয়ে রাখার এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।

শাহনামার তিন যুগ

‘শাহনামা’কে সাধারণত তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়—পৌরাণিক যুগ, বীরত্বের যুগ এবং ঐতিহাসিক যুগ।

প্রথম অংশে পৃথিবী সৃষ্টি, প্রথম রাজাদের উত্থান এবং মানুষের সভ্যতা গঠনের গল্প রয়েছে। এখানে আগুন আবিষ্কার, কৃষিকাজ এবং সামাজিক জীবনের সূচনার মতো বিষয়ও কাব্যিকভাবে উঠে এসেছে।

দ্বিতীয় অংশটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এখানে পারস্যের কিংবদন্তি বীরদের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে রুস্তমের গল্প শাহনামার প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রুস্তম ছিলেন অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী এক যোদ্ধা, যিনি বহু যুদ্ধ জিতে পারস্যকে রক্ষা করেছিলেন।

তৃতীয় অংশে এসেছে বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনাবলি। আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয়, বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতন এবং শেষ পর্যন্ত আরব বিজয়ের মধ্য দিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের কথা এখানে উঠে এসেছে।

রুস্তম ও সোহরাব: সাহিত্যের এক অনন্ত ট্র্যাজেডি

‘শাহনামা’র সবচেয়ে বিখ্যাত এবং আবেগঘন অধ্যায় হলো রুস্তম ও সোহরাবের কাহিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে বাবা ও ছেলে একে অপরকে না চিনেই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। রুস্তম শেষ পর্যন্ত সোহরাবকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। পরে সত্য প্রকাশ হলে তিনি বুঝতে পারেন, যাকে হত্যা করেছেন সে তাঁর নিজের সন্তান।

এই দৃশ্য শুধু পারস্য সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়। মানবিক বেদনা, ভাগ্যের নির্মমতা এবং যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এই কাহিনিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সুলতান মাহমুদ ও ফেরদৌসির বেদনাময় সম্পর্ক

ফেরদৌসির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গজনির সুলতান মাহমুদের নামও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ফেরদৌসি আশা করেছিলেন তাঁর মহাকাব্যের জন্য সুলতান তাঁকে বড় পুরস্কার দেবেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত স্বর্ণমুদ্রার বদলে তাঁকে রৌপ্যমুদ্রা দেওয়া হয়। এতে তিনি অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হন।

কথিত আছে, ফেরদৌসি পরে সুলতানকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লেখেন এবং দরবার ত্যাগ করেন। জীবনের শেষভাগ তিনি দারিদ্র্য ও হতাশার মধ্যে কাটান। পরে সুলতান অনুতপ্ত হয়ে পুরস্কার পাঠালেও তখন ফেরদৌসি মারা গেছেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, পুরস্কারবাহী কাফেলা যখন তুস নগরে পৌঁছায়, ঠিক তখনই কবির জানাজা বের হচ্ছিল।

ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই ঘটনার কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এটি পারস্য সংস্কৃতিতে গভীর আবেগের প্রতীক হয়ে আছে।

An Epic of Kings: The Great Mongol Shahnama - National Museum of Asian Art

ইরানের জাতীয় পরিচয়ে শাহনামার ভূমিকা

‘শাহনামা’ শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি ইরানের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি। আরব বিজয়ের পর যখন অনেক পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই মহাকাব্য পারস্যের মানুষকে তাদের অতীতের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে।

ইরানে আজও ‘শাহনামা’ জাতীয় গৌরবের প্রতীক। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর গল্প পাঠ করা হয়। অনেক পরিবারে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই রুস্তম, সিয়াবাশ কিংবা জালের গল্প শুনে বড় হয়।

পারস্য ক্ষুদ্রচিত্র শিল্পেও ‘শাহনামা’র প্রভাব অসাধারণ। শত শত বছর ধরে শিল্পীরা এই মহাকাব্যের যুদ্ধ, রাজদরবার এবং পৌরাণিক প্রাণীর দৃশ্য চিত্রিত করেছেন। বিশ্বের বহু জাদুঘরে এখনো ‘শাহনামা’র অলংকৃত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।

বিশ্বসাহিত্যে শাহনামার গুরুত্ব

ইউরোপীয় গবেষকেরা উনিশ শতক থেকেই ‘শাহনামা’ নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন। ফরাসি, ইংরেজি, জার্মান, রুশসহ বহু ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। অনেক সাহিত্যবোদ্ধা ফেরদৌসিকে হোমার, দান্তে কিংবা বাল্মীকির সঙ্গে তুলনা করেন।

তবে ফেরদৌসির বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু কাব্য রচনা করেননি; তিনি একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক অবদান ছাড়া আধুনিক পারসি ভাষার বিকাশ হয়তো ভিন্ন রূপ নিত।

ferdowsi tomb of mashhad | Statue of Iranian literature

আজও অমর ফেরদৌসি

ইরানের তুস নগরে ফেরদৌসির সমাধি আজও সাহিত্যপ্রেমীদের তীর্থস্থানের মতো। প্রতিবছর হাজারো মানুষ সেখানে যান শ্রদ্ধা জানাতে। ইরান সরকারও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। (

এক হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও ‘শাহনামা’র আবেদন কমেনি। কারণ এটি শুধু রাজাদের গল্প নয়, মানুষের সাহস, অহংকার, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ভাগ্যের গল্প। যুদ্ধের গল্পের মধ্যেও এখানে মানবতার গভীর আর্তি আছে।

ফেরদৌসি তাঁর কাব্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, একটি জাতির ভাষা ও স্মৃতি যদি সাহিত্যে বেঁচে থাকে, তবে সেই জাতিকে কখনও পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা যায় না। আর সে কারণেই ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’ আজও শুধু ইরানের নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হামে ভয়াবহতা বাড়ছেই, আরও ১০ শিশুর মৃত্যু

ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’: যে কাব্য বাঁচিয়ে রেখেছে পারস্যের আত্মা

০২:৪১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে কিছু সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একটি জাতির অস্তিত্ব, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’ ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মহাকাব্য পারস্য জাতির ইতিহাস, বীরত্ব, ট্র্যাজেডি, প্রেম, যুদ্ধ এবং আত্মপরিচয়ের ধারক হিসেবে টিকে আছে। আর এই মহাকাব্যের রচয়িতা আবুল কাসেম ফেরদৌসি শুধু একজন কবি নন, তাঁকে মনে করা হয় পারস্য ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম মহান রক্ষক।

এক অস্থির সময়ে জন্ম নেওয়া এক কবি

ফেরদৌসির জন্ম হয়েছিল খোরাসানের তুস নগরে, আনুমানিক ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় পারস্য অঞ্চল আরব মুসলিম শাসনের অধীনে। ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষা প্রশাসন, জ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যের প্রধান ভাষায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে পারস্যের বহু প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

তবে পারস্যের মানুষ নিজেদের ইতিহাস ভুলে যেতে রাজি ছিল না। পুরনো রাজাদের গল্প, বীরদের কাহিনি এবং পৌরাণিক কিংবদন্তি লোকমুখে বেঁচে ছিল। ফেরদৌসি বুঝতে পেরেছিলেন, এই গল্পগুলো সংরক্ষণ না করা গেলে একদিন পুরো একটি সভ্যতার স্মৃতি মুছে যাবে। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ—‘শাহনামা’ রচনা।

Shāh-nāmeh | Persian Epic, Epic Poem, Epic Poetry | Britannica

ত্রিশ বছরের সাধনা

‘শাহনামা’ লেখা ছিল কোনো সাধারণ সাহিত্যকর্ম নয়। ফেরদৌসি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মহাকাব্য রচনা করেন। তিনি পুরনো পাণ্ডুলিপি, রাজদরবারের ইতিহাস, লোককাহিনি এবং প্রাচীন পারস্যের মৌখিক ঐতিহ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর আগে দাকিকি নামে আরেক কবি এই কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু অসময়ে নিহত হওয়ায় কাজ শেষ করতে পারেননি। ফেরদৌসি পরে সেই অসমাপ্ত প্রচেষ্টাকেও নিজের কাব্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।

মোট প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার দ্বিপদী নিয়ে গড়ে ওঠা ‘শাহনামা’ বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্যগুলোর একটি। তুলনামূলকভাবে বলা হয়, হোমারের ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’ মিলিয়েও এর চেয়ে ছোট।

ফেরদৌসি এই কাব্য মূলত বিশুদ্ধ পারসি ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছিলেন। আরবি শব্দের ব্যবহার তিনি খুব সীমিত রাখেন। ফলে ‘শাহনামা’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, পারসি ভাষাকে টিকিয়ে রাখার এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।

শাহনামার তিন যুগ

‘শাহনামা’কে সাধারণত তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়—পৌরাণিক যুগ, বীরত্বের যুগ এবং ঐতিহাসিক যুগ।

প্রথম অংশে পৃথিবী সৃষ্টি, প্রথম রাজাদের উত্থান এবং মানুষের সভ্যতা গঠনের গল্প রয়েছে। এখানে আগুন আবিষ্কার, কৃষিকাজ এবং সামাজিক জীবনের সূচনার মতো বিষয়ও কাব্যিকভাবে উঠে এসেছে।

দ্বিতীয় অংশটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। এখানে পারস্যের কিংবদন্তি বীরদের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে রুস্তমের গল্প শাহনামার প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রুস্তম ছিলেন অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী এক যোদ্ধা, যিনি বহু যুদ্ধ জিতে পারস্যকে রক্ষা করেছিলেন।

তৃতীয় অংশে এসেছে বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনাবলি। আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয়, বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতন এবং শেষ পর্যন্ত আরব বিজয়ের মধ্য দিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের কথা এখানে উঠে এসেছে।

রুস্তম ও সোহরাব: সাহিত্যের এক অনন্ত ট্র্যাজেডি

‘শাহনামা’র সবচেয়ে বিখ্যাত এবং আবেগঘন অধ্যায় হলো রুস্তম ও সোহরাবের কাহিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে বাবা ও ছেলে একে অপরকে না চিনেই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। রুস্তম শেষ পর্যন্ত সোহরাবকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। পরে সত্য প্রকাশ হলে তিনি বুঝতে পারেন, যাকে হত্যা করেছেন সে তাঁর নিজের সন্তান।

এই দৃশ্য শুধু পারস্য সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়। মানবিক বেদনা, ভাগ্যের নির্মমতা এবং যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এই কাহিনিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সুলতান মাহমুদ ও ফেরদৌসির বেদনাময় সম্পর্ক

ফেরদৌসির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গজনির সুলতান মাহমুদের নামও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ফেরদৌসি আশা করেছিলেন তাঁর মহাকাব্যের জন্য সুলতান তাঁকে বড় পুরস্কার দেবেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত স্বর্ণমুদ্রার বদলে তাঁকে রৌপ্যমুদ্রা দেওয়া হয়। এতে তিনি অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হন।

কথিত আছে, ফেরদৌসি পরে সুলতানকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লেখেন এবং দরবার ত্যাগ করেন। জীবনের শেষভাগ তিনি দারিদ্র্য ও হতাশার মধ্যে কাটান। পরে সুলতান অনুতপ্ত হয়ে পুরস্কার পাঠালেও তখন ফেরদৌসি মারা গেছেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, পুরস্কারবাহী কাফেলা যখন তুস নগরে পৌঁছায়, ঠিক তখনই কবির জানাজা বের হচ্ছিল।

ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই ঘটনার কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এটি পারস্য সংস্কৃতিতে গভীর আবেগের প্রতীক হয়ে আছে।

An Epic of Kings: The Great Mongol Shahnama - National Museum of Asian Art

ইরানের জাতীয় পরিচয়ে শাহনামার ভূমিকা

‘শাহনামা’ শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি ইরানের জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি। আরব বিজয়ের পর যখন অনেক পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই মহাকাব্য পারস্যের মানুষকে তাদের অতীতের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে।

ইরানে আজও ‘শাহনামা’ জাতীয় গৌরবের প্রতীক। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এর গল্প পাঠ করা হয়। অনেক পরিবারে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই রুস্তম, সিয়াবাশ কিংবা জালের গল্প শুনে বড় হয়।

পারস্য ক্ষুদ্রচিত্র শিল্পেও ‘শাহনামা’র প্রভাব অসাধারণ। শত শত বছর ধরে শিল্পীরা এই মহাকাব্যের যুদ্ধ, রাজদরবার এবং পৌরাণিক প্রাণীর দৃশ্য চিত্রিত করেছেন। বিশ্বের বহু জাদুঘরে এখনো ‘শাহনামা’র অলংকৃত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।

বিশ্বসাহিত্যে শাহনামার গুরুত্ব

ইউরোপীয় গবেষকেরা উনিশ শতক থেকেই ‘শাহনামা’ নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন। ফরাসি, ইংরেজি, জার্মান, রুশসহ বহু ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। অনেক সাহিত্যবোদ্ধা ফেরদৌসিকে হোমার, দান্তে কিংবা বাল্মীকির সঙ্গে তুলনা করেন।

তবে ফেরদৌসির বিশেষত্ব হলো, তিনি শুধু কাব্য রচনা করেননি; তিনি একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক অবদান ছাড়া আধুনিক পারসি ভাষার বিকাশ হয়তো ভিন্ন রূপ নিত।

ferdowsi tomb of mashhad | Statue of Iranian literature

আজও অমর ফেরদৌসি

ইরানের তুস নগরে ফেরদৌসির সমাধি আজও সাহিত্যপ্রেমীদের তীর্থস্থানের মতো। প্রতিবছর হাজারো মানুষ সেখানে যান শ্রদ্ধা জানাতে। ইরান সরকারও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। (

এক হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও ‘শাহনামা’র আবেদন কমেনি। কারণ এটি শুধু রাজাদের গল্প নয়, মানুষের সাহস, অহংকার, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ভাগ্যের গল্প। যুদ্ধের গল্পের মধ্যেও এখানে মানবতার গভীর আর্তি আছে।

ফেরদৌসি তাঁর কাব্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, একটি জাতির ভাষা ও স্মৃতি যদি সাহিত্যে বেঁচে থাকে, তবে সেই জাতিকে কখনও পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা যায় না। আর সে কারণেই ইরানের মহাকাব্য ‘শাহনামা’ আজও শুধু ইরানের নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ।