ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর এ বছর তার ২৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে নতুন প্রদর্শনী, উন্নত সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে। ১৭৭৮ সালের ২৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর আজ দেশটির বৃহত্তম সংগ্রহশালা, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম থেকে শুরু করে রাজকীয় ঐতিহ্য, প্রাচীন মুদ্রা এবং সভ্যতার নানা নিদর্শনসহ প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার বস্তু সংরক্ষিত রয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ধাক্কা পেরিয়ে নতুন যাত্রা
২০২৩ সালে জাদুঘরের একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে ভবনের কিছু অংশ এবং শত শত সংগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর জাদুঘরটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে নেদারল্যান্ডস থেকে ফিরিয়ে আনা তিন শতাধিক ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
সম্প্রতি আরও একটি বড় সংযোজন হয়েছে। ডাচ চিকিৎসক ইউজিন দুবোয়ার সংগ্রহ থেকে ২৮ হাজারের বেশি জীবাশ্ম জাদুঘরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত ‘জাভা ম্যান’—বিশ্বের প্রথম আবিষ্কৃত হোমো ইরেক্টাস জীবাশ্ম। এক শতাব্দীরও বেশি সময় নেদারল্যান্ডসে থাকার পর এগুলো এখন ইন্দোনেশিয়ায় ফিরেছে এবং স্থায়ী প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে দর্শকদের সামনে রাখা হয়েছে।
মুদ্রার ইতিহাসে এক দীর্ঘ যাত্রা
জাদুঘরের নতুন স্থায়ী প্রদর্শনীগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘নুমিসমাতিক’। এখানে ইন্দোনেশিয়ায় অর্থের বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে দেখা যায়, একসময় পালিশ করা পাথরের কুঠার, ঝিনুক, পুঁতি কিংবা ব্রোঞ্জের ঢোলও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওজনভিত্তিক মুদ্রা আসে। চীনা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসে ছিদ্রযুক্ত গোলাকার মুদ্রা, যা বহু শতাব্দী ধরে দ্বীপপুঞ্জজুড়ে প্রচলিত ছিল।
এখানে ইন্দোনেশিয়ার প্রথম কাগুজে মুদ্রা, স্বাধীনতার পর চালু হওয়া ‘ওআরআই’ নোট এবং ১৯৫০ সালের বিখ্যাত ‘শ্যাফরুদ্দিনের কাঁচি’ নীতির স্মৃতিচিহ্নও প্রদর্শিত হচ্ছে। সে সময় নির্দিষ্ট মূল্যমানের নোট অর্ধেক কেটে অর্থনীতিতে মুদ্রার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আলোর ইতিহাসে সংস্কৃতি ও মর্যাদার ছাপ
আরেকটি স্থায়ী প্রদর্শনী ‘পেন্দার’ দর্শকদের নিয়ে যায় আলোকসজ্জার ইতিহাসে। শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত তেলের প্রদীপ, ঝাড়বাতি এবং লণ্ঠনের সংগ্রহ এখানে স্থান পেয়েছে।
প্রাচীন যুগে সাধারণ মানুষ যেখানে মাটির বা পাথরের প্রদীপ ব্যবহার করত, সেখানে অভিজাত শ্রেণি ব্রোঞ্জ ও পিতলের অলংকৃত প্রদীপ ব্যবহার করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিজ্জ তেলের পরিবর্তে কেরোসিনের ব্যবহার শুরু হয় এবং ইউরোপীয় প্রযুক্তির প্রভাবে ঝাড়বাতি ও দেয়ালবাতির নকশায় বৈচিত্র্য আসে।
প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ সূক্ষ্ম কারুকাজে নির্মিত ‘শ্রী তাঞ্জুং’ নামের একটি তেলের প্রদীপ, যা প্রাচীন সাংস্কৃতিক প্রতীক ও শিল্পকলার অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জেপারার কাঠখোদাই শিল্পের গল্প
স্থায়ী প্রদর্শনীর পাশাপাশি ‘তাতাহ’ নামে একটি অস্থায়ী প্রদর্শনীও চালু হয়েছে, যা আগামী জুলাই পর্যন্ত চলবে। এতে জেপারা অঞ্চলের বিখ্যাত কাঠখোদাই শিল্পের ইতিহাস ও বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে ১৬শ শতকের শাসক রতু কালিনিয়ামাতের সামুদ্রিক শক্তির ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম এবং সমসাময়িক ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে জাতীয় বীর রাদেন আজেং কার্তিনির হাতে লেখা চিঠির প্রতিলিপি, যেখানে তিনি জেপারার কারুশিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতি নিয়ে লিখেছিলেন।
অতীত ও বর্তমানের এই মেলবন্ধনের মাধ্যমে জাতীয় জাদুঘর শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও জীবন্ত করে তুলছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় জাদুঘর
২৪৮ বছরে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় জাদুঘরে নতুন প্রদর্শনী, ফিরছে ঐতিহাসিক জীবাশ্ম ও সাংস্কৃতিক সম্পদ।
জাকার্তার জাতীয় জাদুঘর ২৪৮ বছরে পা দিয়েছে নতুন প্রদর্শনী, ঐতিহাসিক জীবাশ্ম প্রত্যাবর্তন এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক সংগ্রহ নিয়ে। বিস্তারিত পড়ুন।
#ইন্দোনেশিয়া #জাতীয়জাদুঘর #জাকার্তা #ইতিহাস #সাংস্কৃতিকঐতিহ্য #জীবাশ্ম #জাভাম্যান #প্রদর্শনী #পর্যটন #সংগ্রহশালা
Sarakhon Report 


















