বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া একমাত্র কুমিরকে ফেরত আনার দাবিতে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রোববার বিকেলে বাগেরহাট প্রেসক্লাবে সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, মাজারের দিঘি থেকে কুমির অপসারণের সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, কুমিরটি শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং বাগেরহাটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে কুমির
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাজার, দিঘি এবং কুমির বহু শতাব্দী ধরে দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী ও ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্র। কুমিরটি বাগেরহাটের ঐতিহ্যের প্রতীক এবং ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক হিসেবে পরিচিত।
বক্তারা দাবি করেন, কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার আগে স্থানীয় জনগণ, মাজার কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি। তারা দ্রুত কুমিরটিকে দিঘিতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

শিশুর মৃত্যুতেও শোক, তবু ফেরানোর দাবি
সম্প্রতি দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে আট বছর বয়সী ফাতেমা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন বক্তারা। তবে তাদের মতে, কুমির সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নিরাপত্তা বেষ্টনী, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত তদারকির মাধ্যমে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।
তারা বলেন, কুমিরটি বাগেরহাটের পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই এটিকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কুমিরটি দিঘিতে ফিরিয়ে না আনা হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
গত ১ জুন মাজারের দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে ফাতেমা আক্তার কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়। পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন জরুরি বৈঠক করে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

৩ জুন বন বিভাগের একটি দল কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করে। বর্তমানে সেখানেই প্রাণীটি রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ভবিষ্যতে দিঘির মধ্যে নিরাপদ ঘেরা এলাকা তৈরি করা হলে কুমিরটিকে আবার ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কুমিরটি প্রায় ৪৫ বছর বয়সী একটি স্ত্রী মিঠাপানির কুমির। এর ওজন প্রায় ৬০০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৯ ফুট ৩ ইঞ্চি।
ইতিহাসের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলী (রহ.) এই দিঘি খনন করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে মিঠাপানির কুমির এই দিঘির অন্যতম পরিচয় হয়ে আছে। একসময় এখানে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে পরিচিত কুমিরের জোড়া ছিল। সময়ের সঙ্গে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি কুমিরই টিকে ছিল।
সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কুমিরটি বিশেষ পরিচর্যার আওতায় ছিল এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















