যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার। প্রায় ৮৫ কোটি ডলারের বেসরকারি অর্থায়নে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পটি একদিকে যেমন একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, অন্যদিকে এর নকশা, অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রদায়ভিত্তিক উন্নয়নের বড় স্বপ্ন
শিকাগোর ঐতিহাসিকভাবে অবহেলিত কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রের লক্ষ্য শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করা নয়, বরং স্থানীয় জনগণের জন্য একটি উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত সামাজিক কেন্দ্র তৈরি করা। প্রায় ১৯ একরের বেশি জায়গাজুড়ে নির্মিত ক্যাম্পাসে রয়েছে খেলার মাঠ, শিশুদের জন্য খেলার স্থান, পিকনিকের ব্যবস্থা, শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য রান্নাঘর, ফল ও সবজির বাগান এবং নানা ধরনের জনসেবামূলক সুবিধা।
এখানে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম, জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য বৈঠককক্ষ এবং শিকাগো পাবলিক লাইব্রেরির একটি শাখাও রয়েছে। অধিকাংশ সুবিধাই বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

স্থাপত্য নিয়ে প্রশংসা ও সমালোচনা
কেন্দ্রটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো এর বিশাল গ্রানাইট-আবৃত জাদুঘর টাওয়ার। ওবামার ইচ্ছা ছিল এটি যেন চারটি উঁচু হয়ে থাকা হাতের প্রতীক হয়। তবে সমালোচকদের একাংশের মতে, টাওয়ারটি দূর থেকে অনেকটা বিশাল পাথরের খণ্ড বা দুর্গের মতো মনে হয়, যা উষ্ণ ও স্বাগতপূর্ণ পরিবেশের বার্তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবুও স্থপতিরা এর নকশায় শিল্প, ইতিহাস এবং গণতন্ত্রের প্রতীকী উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। টাওয়ারের সর্বোচ্চ তলায় থাকা দর্শনকক্ষ থেকে পুরো শিকাগো শহরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
জ্যাকসন পার্ককে ঘিরে বিতর্ক
এই প্রকল্পের জন্য জ্যাকসন পার্কের একটি অংশ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেক স্থানীয় সংগঠন মনে করেছিল, অন্য কোনো অব্যবহৃত এলাকায় কেন্দ্রটি নির্মাণ করলে অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি উপকার হতো। পাশাপাশি আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্থানচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি পার্কের পরিবেশ উন্নয়নেও বড় ধরনের কাজ করা হয়েছে। পুরোনো একটি ব্যস্ত সড়ক সরিয়ে সেখানে হাঁটার পথ ও সাইকেল লেন তৈরি করা হয়েছে, যা এলাকাটির পরিবেশকে আরও বাসযোগ্য করে তুলেছে।
গণতন্ত্রের বার্তা
কেন্দ্রের জাদুঘরে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন, নাগরিক অধিকার সংগ্রাম এবং ওবামা পরিবারের জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীর মূল বার্তা হলো—গণতন্ত্র একটি যৌথ দায়িত্ব এবং সমাজ গঠনে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য।
নতুন দৃষ্টান্তের সূচনা?
এই কেন্দ্রটি প্রচলিত প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির ধারণা থেকে কিছুটা আলাদা। ওবামার সরকারি নথিপত্র ডিজিটাল আকারে সংরক্ষিত থাকবে এবং গবেষণার জন্য আলাদা স্থানে রাখা হয়েছে। ফলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারক নির্মাণে নতুন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
সমর্থকদের মতে, এই প্রকল্প শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনবে। আর সমালোচকদের মতে, এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্মারক নির্মাণের প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে কেন্দ্রটি স্থানীয় জনগণের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত এর প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে উঠবে।










সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















