ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজ এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে। একের পর এক গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রে হামলার কারণে শুধু প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ পণ্য ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাও পড়েছে গভীর অনিশ্চয়তায়।
মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়াজুড়ে ওয়াইল্ডবেরিজের অন্তত ২০টি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কোথাও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, কোথাও পুরো গুদাম ধ্বংস হয়েছে, আবার কোথাও সরবরাহব্যবস্থা এতটাই ব্যাহত হয়েছে যে ব্যবসায়ীদের হাতে থাকা পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলায় ওয়াইল্ডবেরিজের অন্তত ১১ লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার গুদাম এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠানটির মোট গুদাম সক্ষমতার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
এক মাসেই ব্যবসায় ধস
মস্কোর ওয়াইল্ডবেরিজের একটি পণ্য সংগ্রহকেন্দ্র পরিচালনা করেন ভাসিলি ক্লিমভ। হামলার আগে তার ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়।
আগে তার কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি পণ্য পৌঁছাত। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১৫০টিতে। একপর্যায়ে এমন দিনও এসেছে, যখন কোনো পণ্যই তার কেন্দ্রে পৌঁছায়নি।
ক্লিমভ জানান, গত এক মাসে তার বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। পণ্য সরবরাহ কমে যাওয়ায় আয় কমলেও দোকানের ভাড়া, কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ব্যয় একই রয়েছে। ফলে ব্যবসাটি এখন লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তিনি নিজের ব্যবসা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু ক্রেতা খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু ওয়াইল্ডবেরিজ নয়, বিপদে হাজারো ব্যবসা
ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার বিশাল অনলাইন বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির পাশাপাশি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশেও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৮ হাজার পণ্য সংগ্রহকেন্দ্র রয়েছে।
এই কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগই ছোট উদ্যোক্তারা পরিচালনা করেন। তাদের আয় নির্ভর করে গ্রাহকদের অর্ডার সংগ্রহের ওপর। ফলে ওয়াইল্ডবেরিজের সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় সরাসরি আঘাত এসেছে তাদের আয়ের ওপর।
অন্যদিকে হাজার হাজার বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে তাদের পণ্য সংরক্ষণ করেন। গুদামে আগুন বা হামলা হলে একসঙ্গে বহু ব্যবসায়ীর পণ্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
ফলে যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকা ছোট ব্যবসাগুলোও এখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

গুদামে আগুন, পুড়ছে ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন
রাশিয়ার পোশাক ব্র্যান্ড ফিন ফ্লেয়ার জুলাইয়ে ওয়াইল্ডবেরিজের ইলেকট্রোস্তাল গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ কোটি রুবেলের বেশি মূল্যের পণ্য হারিয়েছে।
পণ্য মজুত কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনলাইন অর্ডারও কমেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন ওয়াইল্ডবেরিজের সঙ্গে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া ও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আলোচনা করতে চায়।
শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, ছোট উদ্যোক্তারাও একই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। হাতে তৈরি টফি বিক্রি করা ব্যবসায়ী আন্না স্তারোস্তিনা ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামে হামলার ঘটনায় ১৭০ বাক্স মিষ্টি হারিয়েছেন।
তার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এমন ক্ষতি সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ একটি বড় চালান হারিয়ে গেলে নতুন করে পণ্য তৈরি বা বাজারজাত করার মতো অর্থ অনেকের হাতেই থাকে না।
বিক্রির জন্য উঠেছে হাজারো সংগ্রহকেন্দ্র
সংকট কতটা গভীর হয়েছে, তার একটি বড় উদাহরণ হলো ওয়াইল্ডবেরিজের সংগ্রহকেন্দ্র বিক্রির প্রবণতা।
রাশিয়ার একটি অনলাইন বাজারে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১০০টির বেশি ওয়াইল্ডবেরিজের সংগ্রহকেন্দ্র বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে।
অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে লোকসান আরও বাড়বে। তাই ব্যবসা ধরে রাখার বদলে তারা এখন যত দ্রুত সম্ভব তা বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে চাইছেন।
এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়ার খুচরা বাণিজ্য খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতেও শুরু হয়েছে উদ্বেগ
ওয়াইল্ডবেরিজকে ঘিরে সংকট এখন ব্যাংকিং খাতেও প্রভাব ফেলছে।
রাশিয়ার অন্যতম বড় ব্যাংক এসবেরব্যাংক জানিয়েছে, অনলাইন বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ সংরক্ষণ করতে হতে পারে।
প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ঋণ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
এর অর্থ হলো, গুদামে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনা শুধু ব্যবসার বিক্রিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; এটি উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও এই পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
দেশটির সুদের হার বর্তমানে ১৪ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে বড় ধাক্কা এলে বাজারে পণ্যের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং দাম বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি আবার বাড়তে শুরু করে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার কমানোর গতি ধীর করতে কিংবা পুরো প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হতে পারে।
অর্থাৎ একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গুদামে হামলার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক নীতিতেও পৌঁছে যেতে পারে।
সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
রাশিয়ার সরকার ইতোমধ্যে ওয়াইল্ডবেরিজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোকে সহায়তা করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া, কর ছাড় এবং ভর্তুকি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। ওয়াইল্ডবেরিজও জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতাদের জন্য ছাড় বাড়ানো হয়েছে, অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে এবং ৯৭ হাজারের বেশি বিক্রেতাকে প্রাথমিকভাবে স্বেচ্ছা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
তবে ক্ষতির পরিমাণ যদি আরও বাড়ে, তাহলে সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়াবে—কত ব্যবসাকে এবং কত অর্থ দিয়ে সহায়তা করা সম্ভব?
একটি সরকারি সূত্রের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বড় ধরনের দেউলিয়াত্বের ঢেউ দেখা দিতে পারে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধ এবার পৌঁছে গেছে সাধারণ ব্যবসায়ীর দরজায়
ইউক্রেন বলছে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে এসব হামলার উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য মস্কোর জন্য বাড়িয়ে দেওয়া এবং সাধারণ রুশ নাগরিকদের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব আরও স্পষ্ট করে তোলা।
অন্যদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। দুই পক্ষই দাবি করছে, লক্ষ্যবস্তু স্থাপনাগুলোর সঙ্গে সামরিক কার্যক্রম বা সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সম্পর্ক রয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সেনাবাহিনী বা যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
মস্কোর একজন ছোট ব্যবসায়ী, গুদামে পণ্য রাখা একজন উদ্যোক্তা কিংবা অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা একজন কারিগরও এখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সরাসরি অনুভব করছেন।
সামনে আরও বড় সংকট?
ওয়াইল্ডবেরিজ দ্রুত নতুন গুদাম ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। কিন্তু হামলা অব্যাহত থাকলে নতুন অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বিস্তৃত ও বিকেন্দ্রীভূত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি হয়ে উঠবে।
কারণ ব্যবসায়ীরা যদি মনে করেন তাদের পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, তাহলে তারা বিকল্প অনলাইন বাজারে চলে যেতে পারেন। এতে রাশিয়ার অনলাইন বাণিজ্য খাতের প্রতিযোগিতার কাঠামোও বদলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ওয়াইল্ডবেরিজের ওপর হামলা রাশিয়ার অর্থনীতিতে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। গুদামে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের পণ্য, কমছে বিক্রি, বাড়ছে ঋণের চাপ এবং তৈরি হচ্ছে মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি।
একটি অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়—এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে রাশিয়ার হাজারো উদ্যোক্তা, ব্যাংক, ভোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
যুদ্ধের ময়দান যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—যুদ্ধের আসল মূল্য শুধু সীমান্তে নয়, দেশের বাজার ও সাধারণ মানুষের ব্যবসার মধ্যেও দিতে হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















