বন্দে মাতরমের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাওয়া নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (সিডব্লিউসি) দলীয় কর্মসূচিতে জাতীয় সংগীতের প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিজেপি কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করেছে। বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, ভোটব্যাংকের রাজনীতির কারণে কংগ্রেস দেশের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিচ্ছে এবং দলটি আজকের ‘নতুন মুসলিম লীগে’ পরিণত হয়েছে।
বন্দে মাতরম নিয়ে বিজেপির আক্রমণ
বুধবার কংগ্রেসের সিডব্লিউসি ১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে দলীয় কর্মসূচিতে বন্দে মাতরমের শুধু প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর একদিন পর বৃহস্পতিবার নিতিন নবীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেসের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, কংগ্রেস এখন তাদের কথিত ‘অপমান’কে আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত করেছে। তাঁর দাবি, কয়েক দিন আগে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরম পরিবেশনের সময় কংগ্রেস নেতাদের আচরণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তখন দলটি সেটিকে কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। এখন একই বিষয় দলীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নবীনের ভাষ্য, বন্দে মাতরম ‘ভারতমাতা’র পবিত্র আহ্বান এবং এই গানকে ঘিরে অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস ভোটব্যাংকের স্বার্থে জাতীয় আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিচ্ছে।
বিরোধীদের পাল্টা চ্যালেঞ্জ
বিজেপির অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ। তিনি নিতিন নবীনকে প্রকাশ্যে বন্দে মাতরমের পুরো সংস্করণ আবৃত্তির চ্যালেঞ্জ জানান। আজাদ বলেন, তিনি নিজে পুরো গানটি জানেন না, তবে কাগজ দেখে পড়তে প্রস্তুত এবং নবীনকেও পুরো গানটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আবৃত্তি করতে হবে।
শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউতও বিজেপির সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উচিত প্রকাশ্যে বন্দে মাতরমের ছয়টি স্তবক টেলিপ্রম্পটার ছাড়া গেয়ে দেখানো।
রাউত আরও বলেন, ভারতের স্বাধীনতার আগে এবং সংবিধান প্রণয়নের আগেই ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি বন্দে মাতরমের দুই স্তবক গ্রহণ করেছিল। বিজেপি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বড় নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কংগ্রেসের
কংগ্রেস তাদের বর্তমান সিদ্ধান্তের পক্ষে ১৯৩৭ সালের সিডব্লিউসি প্রস্তাবকে ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কে সি বেণুগোপাল বলেন, ১৯৩৭ সাল থেকেই দলটি বন্দে মাতরমের এই দুই স্তবক গেয়ে আসছে। তাঁর মতে, এতে নতুন কিছু নেই।
বেণুগোপালের অভিযোগ, বিজেপির কাছে বন্দে মাতরম রাজনৈতিক বিষয় হলেও কংগ্রেসের কাছে এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের আবেগের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে কাগজ ফাঁস, অনুদান চুরি এবং অরুণাচল প্রদেশে চীনা অনুপ্রবেশের মতো ইস্যু থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন।
অমিত শাহের কড়া আক্রমণ
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে ‘দেশবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তামিলনাড়ুর চেঙ্গলপাট্টুতে তিনি অভিযোগ করেন, ১৯৩৭ সালে মুসলিম তোষণের জন্য বন্দে মাতরম ভাগ করার মাধ্যমে কংগ্রেস দেশভাগের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
শাহের দাবি, কংগ্রেসের বর্তমান সিদ্ধান্ত দলটির তোষণনীতিরই প্রমাণ। তিনি বন্দে মাতরমের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদেরও কংগ্রেস অপমান করেছে বলে অভিযোগ করেন। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস আবারও তোষণের রাজনীতি ফিরিয়ে আনছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আগস্ট ১৫-এর অনুষ্ঠান ঘিরে বিতর্ক
এর আগে ১৫ আগস্ট কংগ্রেসের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরম পরিবেশনের সময় দলীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধীর কথোপকথন নিয়ে বিজেপি আপত্তি তোলে। বিজেপি এ ঘটনায় কংগ্রেসের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। তবে কংগ্রেস ঘটনাটিকে কাকতালীয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
ফলে ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বন্দে মাতরম নিয়ে নতুন বিতর্ক এখন সরাসরি কংগ্রেস-বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















