নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার ঘটনা থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে তাদের ধারণা, প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় এক হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পলি নেমে এসে ভয়াবহ পানির স্রোত তৈরি করে।
ইতোমধ্যে এই দুর্যোগে প্রায় ১৭০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৫০০। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৭০০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপগ্রহচিত্রে ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র
দুর্যোগের আগে ও পরের উপগ্রহচিত্রে অঞ্চলটির ভয়াবহ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল এখন বাদামি পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধসে পড়ার সময় বিপুল পরিমাণ শিলা ও পলি সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে আসে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই উপত্যকায় বিশাল জল ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হয়।
ভূবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকার তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, আগের দিন বরফে ঢাকা থাকা কয়েকটি হিমবাহের বড় অংশ পরদিন প্রায় বরফমুক্ত হয়ে যায়। এতে দ্রুত বরফ গলার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসের কম্পন
প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা এই দুর্যোগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ওই অঞ্চলের একটি ভূমিকম্পের কথা বলেছিলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, যে কম্পনের খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেটি সম্ভবত আলাদা কোনো ভূমিকম্প নয়। বরং হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তির ফলেই ওই কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
নেপালের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে লেন্দে নদীতে ভূমিধসের পর বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষসহ ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়।
উষ্ণতা বৃদ্ধি কতটা দায়ী
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো গত ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। গত এক দশকে দেশটির হিমবাহ গলার গতি আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এবারের বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত তুষার ও বরফ গলে যাওয়ার বিষয়টি দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণকাজও পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নদীতে কয়েক মিনিটেই ভয়াবহ স্রোত
পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রয়েছে। হিমবাহ ধসের পর পানি, পলি ও বিশাল পাথরের স্রোত ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দ্রুত নিচের দিকে ছুটে যায়।
নদীর নিচের দিকে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় নয় মিটার বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এত অল্প সময়ে পানির স্তরের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দুর্যোগটির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
হিমালয়জুড়ে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো দুর্যোগের সংখ্যা এবং তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবন, বসতি, নদী ও অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
নেপালের এবারের ভয়াবহ বন্যা সেই ঝুঁকিরই আরেকটি নির্মম উদাহরণ। হিমবাহ ধস, দ্রুত বরফ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি নদীতে আকস্মিক পানির চাপ—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নেপালের দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পুরোপুরি জানতে আরও সময় লাগতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















