২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে তালেবান। এরই মধ্যে তাদের শাসনের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে দেশটিতে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি কতটা ফিরেছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়। বরং আফগানদের বড় একটি অংশের মধ্যে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে।
তালেবান সমর্থকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, তাদের শাসন না থাকলে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পরও দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সংকট স্পষ্ট।
যেভাবে আবার ক্ষমতায় ফিরল তালেবান
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশ করলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। তিন লাখের বেশি সদস্যের আফগান জাতীয় সেনাবাহিনীও অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই দশক পর আবার আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা তালেবানের হাতে চলে যায়।
তবে ২০২১ সালের এই ক্ষমতা দখলের পেছনে ২০২০ সালের দোহা চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ওই চুক্তিতে তালেবান আফগানিস্তানে একটি বিস্তৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই সরকারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণের পথ তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে তালেবান সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি।
প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি
তালেবান নিজেদের সরকারকে আফগানিস্তানের সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত।
১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানে তালেবান আন্দোলনের উত্থানের পর থেকেই সংগঠনটি মূলত পশতুন জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক একটি আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। সংগঠনের মধ্যে তাজিক ও উজবেক সদস্য থাকলেও সংখ্যাগত ও নেতৃত্বের বিচারে পশতুনদের প্রাধান্য বরাবরই ছিল।
এই জাতিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আফগান তালেবানের সঙ্গে জাতিগত ও আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার কারণে পাকিস্তানি তালেবান দীর্ঘদিন ধরে তাদের সমর্থন দিয়ে এসেছে।
অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষ
ক্ষমতায় আসার পর তালেবান সরকার কিছু অবকাঠামোগত কাজ করেছে এবং কাবুলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ মৌলিক জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটাতে সংগ্রাম করছে। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ চরম অর্থনৈতিক চাপ ও জীবিকা-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ধর্মীয় আবেগ বা তালেবানের কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে দেশটির সামগ্রিক অবস্থাকে সফল বলে দাবি করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণ আফগানদের খাদ্য, কর্মসংস্থান, আয় ও নিরাপত্তার সংকট এখনো বড় বাস্তবতা।
আফগান মাটি থেকে সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রশ্ন
দোহা চুক্তিতে তালেবান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—আফগান ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
প্রতিবেশী দেশগুলোকেও তালেবান আশ্বস্ত করেছিল যে আফগানিস্তানের মাটিতে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হবে না। কিন্তু পাকিস্তানের অভিযোগ, পাকিস্তানি তালেবানের বিরুদ্ধে তালেবান সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে পাকিস্তানি তালেবানের হামলা বেড়ে যাওয়ায় কাবুল ও ইসলামাবাদের সম্পর্কেও তীব্র টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আল-কায়েদা, পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামি আন্দোলন, উজবেকিস্তানের ইসলামি আন্দোলন এবং তাজিকিস্তানের জামাত আনসারুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর উপস্থিতি আফগানিস্তানের প্রতিবেশীদের জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করছে।
তালেবানের বিরুদ্ধে আবারও সশস্ত্র প্রতিরোধ
এই পরিস্থিতির মধ্যেই তালেবানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে। আহমদ মাসুদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় প্রতিরোধ ফ্রন্ট, সাবেক আফগান সেনা কর্মকর্তা জেনারেল ইয়াসিন জিয়ার নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট এবং সাবেক বিশেষ বাহিনী কমান্ডার সামি সাদাতের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান—এই তিনটি গোষ্ঠী তালেবানের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহে এসব গোষ্ঠী আফগানিস্তানের নয়টি প্রদেশে তালেবান অবস্থানে অন্তত ১৫টি হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলায় প্রায় ৩০ জন তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে।
বাদাখশান, কুন্দুজ, বাগলান, কাবুল, ফারিয়াব, ঘোর, হেরাত, কান্দাহার ও হেলমান্দে এসব হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ঐক্যবদ্ধ হলে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
এখন পর্যন্ত তালেবানবিরোধী এসব গোষ্ঠী একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বা সামরিক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে তারা যদি নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারে কিংবা একসঙ্গে কাজ শুরু করে, তাহলে আফগানিস্তানে নতুন করে বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু আফগানিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পাকিস্তানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শরণার্থী প্রবাহ বাড়তে পারে, সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বিস্তৃত হতে পারে এবং আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পাঁচ বছর পরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর তালেবান এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে একদিকে তাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ তাই শুধু তালেবানের ক্ষমতায় থাকার ওপর নির্ভর করছে না; বরং তারা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ কমাতে পারে এবং আফগান ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—তার ওপরই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















