প্রচণ্ড গরমেও হাতি ঘামতে পারে না। অথচ আফ্রিকার তীব্র রোদে তারা সহজেই টিকে থাকে। এবার হাতির চামড়ার সেই প্রাকৃতিক কৌশল অনুসরণ করে ভবন ঠান্ডা রাখার অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন একদল গবেষক।
হাতির চামড়ার ফাটলেই লুকিয়ে রহস্য
গবেষকদের মতে, হাতির চামড়ায় থাকা অসংখ্য সূক্ষ্ম ফাটলের মধ্যে পানি আটকে থাকে। হাতি শরীরে পানি ছিটালে সেই পানি দ্রুত গড়িয়ে পড়ে না। বরং ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়। পানি বাষ্পে পরিণত হওয়ার সময় শরীর থেকে তাপ শোষণ করে নেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হাতির শরীর তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।
এই প্রাকৃতিক কৌশল থেকেই গবেষকদের মাথায় আসে ভবনের বাইরের আবরণ ঠান্ডা রাখার ধারণা। স্থাপত্য ও প্রকৌশলবিদ্যার গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে সিমেন্টভিত্তিক বিশেষ ধরনের নির্মাণসামগ্রী, যা পানি ধরে রেখে ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত করতে পারে।
পাখা বা যন্ত্র ছাড়াই ঠান্ডা রাখবে ভবন
নতুন এই নির্মাণসামগ্রীতে কোনো পাখা, সংকোচক বা চলমান যন্ত্রাংশের প্রয়োজন নেই। বাইরের আবরণে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হওয়ার সময় তাপ শোষণ করে নেয়। ফলে ভবনের বাইরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমে আসে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাপ প্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি দেওয়ার পরও এই বিশেষ আবরণের নিচের তাপমাত্রা প্রায় ৮৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে স্থির ছিল।
অন্যদিকে একই পরিবেশে পরীক্ষিত ফাটলযুক্ত প্রচলিত দেয়াল আবরণের তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। ফাটলবিহীন আবরণের তাপমাত্রা আরও বেড়ে ১২৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছে যায়।
নির্মাণের দুর্বলতা নয়, ফাটলই হতে পারে শক্তি
গবেষকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পানিকে এমনভাবে আটকে রাখা, যাতে তা দ্রুত গড়িয়ে বা নিষ্কাশিত হয়ে না যায়। সাধারণ নির্মাণসামগ্রীতে পানি অনেক সময় পৃষ্ঠে জমে না থেকে গড়িয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান এসেছে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরির মাধ্যমে। প্রচলিত নির্মাণে ফাটলকে সাধারণত দুর্বলতা ও ক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গবেষকেরা পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় ও নির্দিষ্ট আকৃতিতে ফাটল তৈরি করেছেন। এসব সূক্ষ্ম পথ অনেকটা কৈশিক নালির মতো কাজ করে পানি টেনে নেয় এবং পৃষ্ঠে ধরে রাখে।
ফলে পানির বাষ্পীভবন ধীরে ধীরে চলতে থাকে এবং ভবনের বাইরের পৃষ্ঠ থেকে তাপ সরিয়ে নেয়।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বড় সম্ভাবনা
ভবন ঠান্ডা রাখতে বর্তমানে ব্যাপকভাবে যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার পাশাপাশি ভবনের ভেতরের তাপ বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গবেষকদের মতে, জীবপ্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এই নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রচলিত দেয়াল আবরণের তুলনায় ভবনের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত কমাতে পারে।
বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় ভবন শীতল রাখার জন্য বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো যন্ত্র ছাড়াই বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ভবন ঠান্ডা রাখার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব নির্মাণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
প্রকৃতির একটি সাধারণ কৌশলকে অনুসরণ করে তৈরি এই প্রযুক্তি তাই শুধু ভবন ঠান্ডা রাখার নতুন উপায় নয়, বরং বাড়তে থাকা তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















