০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
স্যান্ডালউড: একটি দামি সুগন্ধি হোসালাদের নীরব জ্যোতি: কার্নাটকের হারানো মন্দির ও শিল্প শেষ মুহূর্ত থেকে নতুন সূচনা: জিওফ ডায়ারের সাহিত্যিক যাত্রা শীতকালে অলিম্পিকের তুষার রহস্য: পর্বতের কুয়াশা থেকে বৈজ্ঞানিক মূল পর্যন্ত কীভাবে ইতিবাচক মনোভাব হৃদয় ও মস্তিষ্ককে করে স্বাস্থ্যবান নতুন কাশ্মীরি গম অলিম্পিকে ফিরে আসার গল্প: অ্যালিসা লিউ স্বর্ণ জিতে ইতিহাস রচনা করলেন বিশ্বের ১.২ বিলিয়ন নতুন কর্মীর জন্য কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করা যায় জাপানে সিইও হওয়ার পথে সিএফওর উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ট্রাম্প শুল্ক বাতিলের প্রভাব: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা

১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ’র জন্য কতটা দায়ী ছিলেন দাদু, সেটাই খুঁজছেন নাতনি

  • Sarakhon Report
  • ০২:১৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪
  • 61

কভিতা পুরী

“যা ঘটেছিল, তার জন্য আমি ভীষণভাবে লজ্জিত,” সুজানা হার্বার্ট আমাকে বলছিলেন।

তার দাদু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে বাংলার গভর্নর। তার আমলেই, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে চরমে উঠেছিল। ওই দুর্ভিক্ষে অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

বাংলা সাল ১৩৫০এ ওই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে এটিকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়ে থাকে।

ওই ভয়াবহ বিপর্যয়ে তার দাদুর ভূমিকা সম্বন্ধে অবশ্য সুজানা সম্প্রতিই জানতে পেরেছেন। তার সেটা জানার পরে তাকে এখন এক জটিল পারিবারিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আমি যখন তার সঙ্গে প্রথম দেখা করি, তখন তার হাতে ধরা ছিল ১৯৪০ সালের একটা ছবি। সেটা ছিল বাংলার গভর্নর-নিবাসে সেবছরের বড়দিন পালনের একটা ছবি।

পুরোদস্তুর আনুষ্ঠানিকতায় ভরা সেই ছবি – সারি দিয়ে সুসজ্জিত হয়ে বসে থাকা মানুষজন, সবার চোখ ক্যামেরার দিকে।

সবথেকে সামনের সারিতে সব গণ্যমান্য ব্যক্তিরা – ঔপনিবেশিক ভারতের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি – বড়লাট লিনলিথগো, আর মিজ হার্বার্টের ঠাকুরদা, বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বার্ট।

ছবিতে, সামনের সারির ওই গণ্যমান্যদের মাঝে, তাদের পায়ের কাছে সাদা জামা-প্যান্ট, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা মোজা আর চকচকে জুতো পায়ে একটি বাচ্চা ছেলেও বসেছিল।

তিনিই সুজানার বাবা।

(সামনের সারিতে সাদা পোষাকের শিশুটিই সুজানা হার্বার্টের বাবা)

ভারতে বড় হয়ে ওঠার কিছু কাহিনী মেয়েকে শুনিয়েছিলেন তিনি। তার মধ্যে একটা ঘটনা ছিল কীভাবে ‘ফাদার ক্রিসমাস’ হাতির পিঠে চেপে এসেছিলেন, সেই গল্পটাও ছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই, আর খুব একটা বেশি কিছু বলেন নি তিনি মেয়েকে।

আর ঠাকুরদার ব্যাপারে খুবই কম কথা বলা হত। তিনি ১৯৪৩ সালেই মারা যান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ

দুর্ভিক্ষের অনেক জটিল কারণ ছিল। গোটা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে জন হার্বার্টই ছিলেন সেই সময়ে বাংলার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাকে জবাবদিহি করতে হত দিল্লিতে, আর সেখানকার কর্মকর্তাদের মাথায় ছিলেন লন্ডনের কর্তাব্যক্তিরা।

ইতিহাসবিদ ও ‘হাংরি বেঙ্গল’ গ্রন্থটির লেখক ড. জনম মুখার্জী আমাকে বলছিলেন মি. হার্বার্ট “ছিলেন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, যিনি সেই সময়ে বাংলার প্রধান কার্যনির্বাহী হিসাবে সরাসরি দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।“

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি একটা নীতি অনুসরণ করতেন – ‘অস্বীকার’ করা, যে নৌকো আর প্রধান খাদ্য চাল বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে অথবা হাজার হাজার গ্রামে সেগুলো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। ভয়টা ছিল যে জাপানিরা যদি আক্রমণ করে, তাহলে শত্রুপক্ষ যাতে স্থানীয় ভাবে রসদ যোগাড় করে ভারতের অভ্যন্তরে অগ্রসর না হতে পারে।

তবে আগে থেকেই নড়বড়ে হয়ে থাকা অর্থনীতির ওপরে এই ঔপনিবেশিক নীতি একটা বিপর্যয় নামিয়ে এনেছিল। জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারতেন না, কৃষকরা নদী বেয়ে তাদের জমিতে যেতে পারতেন না, কারিগরদের অনুমতি ছিল না তাদের তৈরি জিনিষপত্র হাটে-বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসার।

এক কথায়, চাল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যাবে না।

মুদ্রাস্ফীতি আগে থেকেই চড়ে ছিল, কারণ দিল্লির ঔপনিবেশিক সরকার এশিয় যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল খরচ সামাল দেওয়ার জন্য নোট ছেপেই চলেছিল। অন্যদিকে মিত্র শক্তির লক্ষ লক্ষ সৈনিকে কলকাতায় অবস্থান করার কারণে খাবারের যোগানে টান ধরছিল।

জাপানের হাতে বার্মার পতনের পরে সেখান থেকে চাল আমদানিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক সময়েই বাড়তি লাভের আশায় চাল মজুত করে রাখা হত।

এর ওপরে আঘাত হেনেছিল এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, যাতে বাংলার চাষ করা ধানের বেশির ভাগটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভা এবং প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কাছে যুদ্ধের মধ্যেই বারবার খাদ্য সামগ্রী আমদানির জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কখনও আংশিক অনুমতি পাওয়া যেত, অনেক ক্ষেত্রেই অনুরোধ নাকচ করে দেওয়া হত।

(সিল্কের স্কার্ফগুলোতে সুতোর কাজ করে লেখা থাকত ‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’)

‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’

যত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সেই সংখ্যাটা বিপুল। তৎকালীন বাংলার গভর্নরের নাতনি সুজানা ঘটনার অনেক দশক পরেও কেন লজ্জিত বোধ করছিলেন, সেটা এতক্ষণে আমি অনুভব করতে পারছি।

মিজ হার্বার্ট ব্যাখ্যা করার করছিলেন, “যখন ছোট ছিলাম, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকাটা বেশ গৌরবের ব্যাপার বলে মনে করতাম।“

তিনি বলছিলেন যে তার ঠাকুরদার পুরণো পোষাকগুলো চেয়ে নিয়ে আসতেন তিনি।

“সিল্কের স্কার্ফগুলোতে সুতোর কাজ করে লেখা থাকত ‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’,” বলছিলেন তিনি।

“আর এখন যখন আলমারির পেছন দিকে রাখা ওগুলোর দিকে তাকাই, আমি যেন কেঁপে উঠে বলি, এগুলো কেন আমি পরতে চাইতাম! ওই যে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ শব্দগুলো লেখা, সেসব পরা একেবারেই অনুচিত মনে হয় এখন,” বলছিলেন মিজ হার্বার্ট।

বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে যা কিছু পাচ্ছেন, সেসব পড়ে ফেলছেন সুজানা। ওয়েলসে তাদের পারিবারিক বাসভবনের ‘হার্বার্ট সংগ্রহশালায়’ তার পিতামহের যত নথিপত্র রাখা আছে, সেসবও পড়ছেন তিনি।

সব নথি একটা আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা থাকা। মাসে একবার করে একজন সংগ্রহশালা বিশেষজ্ঞ সেখানে আসেন।

যত পড়ছেন, ততই নিজের পিতামহকে বুঝতে পারছেন তিনি।

“এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনি যে সব নীতি চালু করেছিলেন বা প্রয়োগ করেছিলেন, সেসব গুলোই দুর্ভিক্ষের ব্যাপকতার ওপরে গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল,” বলছিলেন মিজ হার্বার্ট।

তার কথায়, “তার দক্ষতা ছিল, তার সম্মান ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক দূরবর্তী প্রান্তে ছয় কোটি মানুষের জীবন জীবিকা নিয়ন্ত্রণ করেন, এরকম একটা পদে তাকে নিয়োগ করাটাই অনুচিত ছিল। “

সুজানা হার্বার্ট (ডাইনে) আর জনম মুখার্জী (বাঁয়ে)

সুজানা হার্বার্ট আর জনম মুখার্জী মুখোমুখি

পারিবারিক সংগ্রহশালায় মিজ হার্বার্ট ১৯৩৯ সালে লেখা একটা চিঠি খুঁজে পেয়েছেন। ওই চিঠিটি স্বামীকে লিখেছিলেন লেডি মেরি, মিজ হার্বার্টের ঠাকুমা। বাংলার গভর্নরের জন্য মনোনীত হওয়ার খবর পেয়েই ওই চিঠি লিখেছিলেন লেডি মেরি। সেখানে ভাল-মন্দ সবরকমই লেখা ছিল। তবে একটা বিষয় তিনি স্বামীকে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাদের যাওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই, যদিও স্বামী যা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই তিনি মেনে নেবেন, এমনটাও লিখেছিলেন লেডি মেরি।

আমি বেশ কয়েক মাস ধরে সুজানা হার্বার্টের সঙ্গে কাজ করছি, তার ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখার আগ্রহ দেখছি। নিজের ঠাকুরদার সম্বন্ধে বিশদে জানতে চাইছেন তিনি, অনেক প্রশ্ন জমে আছে তার মনে।

আর সেই সব প্রশ্ন তিনি সরাসরি করতে চেয়েছিলেন ইতিহাসবিদ জনম মুখার্জীর সামনে।

তাদের দেখা হয় জুন মাসে।

জনম মুখার্জী কখনও কল্পনাও করেন নি যে কখনও তিনি জন হার্বার্টের নাতনির মুখোমুখি বসবেন।

সুজানা হার্বার্ট জানতে চেয়েছিলেন যে একজন পার্লামেন্ট সদস্য, সরকারি দলের মুখ্য সচেতক, এরকম একজন ব্যক্তি – তার ঠাকুরদাকে আদতে কেন এমন একটা পদে নিয়োগ করা হয়েছিল, যখন তার ভারতের রাজনীতি সম্বন্ধে সেরকম কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। সামান্য কিছুদিন দিল্লিতে একজন তরুণ অফিসার হিসাবে তিনি কাজ করেছিলেন শুধু।

মি. মুখার্জীর ব্যাখ্যা, “আধিপত্যের ভাবনা থেকেই যে ঔপনিবেশিকতার জন্ম, তারই অঙ্গ এটা।“

“যাদের উপনিবেশ সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই, ভাষা সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান নেই, যুক্তরাজ্যের বাইরে কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যারা কাজ করে নি, এরকম কিছু পার্লামেন্ট সদস্য খুব সহজেই কলকাতার গভর্নর হাউসে অধিষ্ঠিত হয়ে যেতেন আর এমন এক বিশাল সংখ্যক মানুষের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেন, যাদের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না,” মন্তব্য জনম মুখার্জীর।

(জন হার্বার্ট (বাঁয়ে), সঙ্গে স্ত্রী লেডি মেরি, ১৯৪০ সালের ছবি)

‘দুর্বলতম গভর্নর’

বাংলার রাজনীতিবিদদের কাছে জন হার্বার্ট খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। এমনকি দিল্লিতে তার ঊর্ধ্বতন কর্তারাও তার দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করতেন। এই ঊর্ধ্বতনদের মধ্যে ছিলেন বড়লাট লিনলিথগো-ও।

জনম মুখার্জীর কথায়, “লিনলিথগো তো সরাসরি তাকে ভারতের দুর্বলতম গভর্নর বলে মনে করতেন। সত্যি কথা বলতে তারা সবাই তাকে সরিয়ে দেওয়ারই পক্ষপাতী ছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটাকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে নানা মহলে, তা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন সবাই।“

সুজানার উত্তর ছিল, “এই কথাগুলো শোনা বেশ কঠিন।“

ওদের দুজনেরই একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক জড়িয়ে ছিল গোটা বিষয়ে।

মি. মুখার্জী আর মিজ হার্বার্ট – দুজনের বাবাই মোটামুটি একই সময়ে শিশু অবস্থায়

কলকাতায় কাটিয়েছেন। তবে দুজনের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে।

তারা দুজনেই এখন মারা গেছেন। মিজ হার্বার্টের কাছে তবুও কিছু ছবি রয়েছে।

তবে জনম মুখার্জীর কাছে তার বাবার ছোটবেলার কোনও ছবি নেই।

“তাই আমি যেটুকু জেনেছি, সবই তার রাতের বেলার দুঃস্বপ্নগুলো থেকে, আর একটা ঔপনিবেশিক যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাটানো ছোটবেলার কিছু ঘটনা যা তিনি আমাকে বলেছিলেন, সেসব থেকে।“

এরপরে মি. মুখার্জী এমন একটা কথা বললেন, যেটা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

“আমার ঠাকুরদাও ঔপনিবেশিক পুলিশ বাহিনীতে কাজ করতেন। তাই আমার ঠাকুরদা সেই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় বেশ নিশ্চিন্তেই ছিলেন,” বললেন, জনম মুখার্জী।

বাংলার দুর্ভিক্ষে অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেলেন, অথচ তার কোনও স্মৃতিস্তম্ভ বা এমনকি একটা স্মৃতি ফলকও বিশ্বের কোথাও নেই।

সুজানা হার্বার্ট অন্তত তার ঠাকুরদার একটা স্মৃতি স্তম্ভ দেখাতে পারেন।

“যে চার্চে আমরা প্রার্থনা করি, সেখানে তাকে সম্মান জানিয়ে একটা ফলক আছে,” বলছিলেন তিনি। তবে এটা বোধহয় তার সমাধি না থাকার কারণেই। তার সমাধি কোথায় সেটা ঠিক জানেন না মিজ হার্বার্ট – কলকাতাতে কী?

(দুর্ভিক্ষপীড়িতদের খাবার বিলির সময়ে তৎকালীন বড়লাট স্যার অর্চিবল্ড ওয়াভেল)

 

‘এটা ব্রিটেনের লজ্জা’

নিজের ঠাকুরদার বর্ণনা দেওয়ার জন্য সুজানা হার্বার্ট একটা শব্দ ব্যবহার করতেন, ‘গৌরব’, তবে তিনি তার ঠাকুরদার ব্যর্থতাগুলোও তুলে ধরতেন।

“আমাদের যেভাবে বিষয়গুলি বলা হয়েছিল, আমি এটা মেনে নিই, যে সত্যিকারের ইতিহাস হয়তো তার থেকে আরও অনেক জটিল। তবে এটা মেনে নেওয়া আমার কাছে বেশ কঠিন যে জন হার্বার্ট যে কাজ করেছিলেন, সেটা মোটেই গৌরবের কিছু করেন নি,” বলছিলেন সুজানা হার্বার্ট।

ঘটনার পরে ৮০ বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও এখনও অনেক কিছুরই জট কাটে নি, অনেক কিছুই এখনও অজানা।

অনেক মাস ধরে সুজানা হার্বার্ট যে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন, তার পরেও কী তার কাছে ‘লজ্জা’ শব্দটার মাধ্যমেই তার আবেগটা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে?

তিনি বলছিলেন যে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে।

“আমার মনে হয় ‘লজ্জা’ শব্দটা খুব বেশি আমার ব্যক্তিগত আবেগকে কেন্দ্র করে থাকে। কিন্তু এখানে তো শুধু আমি কী ভাবছি সেটা বড় ব্যাপার না!” বলছিলেন সুজানা হার্বার্ট।

জনম মুখার্জী বললেন, “একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার উত্তরসূরি হিসাবে ‘লজ্জা’ ব্যাপারটা তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিবাহিত হতে পারে না। এটা ব্রিটেনের লজ্জা।“

“বাংলার মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেছেন। তাই ব্যক্তিগত স্তরে এবং সমষ্টিগত ভাবে ইতিহাসের সঠিক প্রতিফলন হওয়া দরকার।“

সেই ইতিহাসই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন সুজানা হার্বার্ট। নিজের বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান তার গবেষণা-লব্ধ তথ্য, যদিও তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে পরিবারের বাকি সবাই কীভাবে সেগুলো নেবে।

তবে তিনি আশা করছেন যে তার সন্তানরা তার কাজে সাহায্য করবে, পারিবারিক সংগ্রহশালায় জমা থাকা নথির পাহাড় ঘেঁটে তাকে কিছুটা সহায়তা করবে।

বিবিসি নিউজ বাংলা

স্যান্ডালউড: একটি দামি সুগন্ধি

১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ’র জন্য কতটা দায়ী ছিলেন দাদু, সেটাই খুঁজছেন নাতনি

০২:১৫:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

কভিতা পুরী

“যা ঘটেছিল, তার জন্য আমি ভীষণভাবে লজ্জিত,” সুজানা হার্বার্ট আমাকে বলছিলেন।

তার দাদু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে বাংলার গভর্নর। তার আমলেই, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে চরমে উঠেছিল। ওই দুর্ভিক্ষে অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

বাংলা সাল ১৩৫০এ ওই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে এটিকে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়ে থাকে।

ওই ভয়াবহ বিপর্যয়ে তার দাদুর ভূমিকা সম্বন্ধে অবশ্য সুজানা সম্প্রতিই জানতে পেরেছেন। তার সেটা জানার পরে তাকে এখন এক জটিল পারিবারিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আমি যখন তার সঙ্গে প্রথম দেখা করি, তখন তার হাতে ধরা ছিল ১৯৪০ সালের একটা ছবি। সেটা ছিল বাংলার গভর্নর-নিবাসে সেবছরের বড়দিন পালনের একটা ছবি।

পুরোদস্তুর আনুষ্ঠানিকতায় ভরা সেই ছবি – সারি দিয়ে সুসজ্জিত হয়ে বসে থাকা মানুষজন, সবার চোখ ক্যামেরার দিকে।

সবথেকে সামনের সারিতে সব গণ্যমান্য ব্যক্তিরা – ঔপনিবেশিক ভারতের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি – বড়লাট লিনলিথগো, আর মিজ হার্বার্টের ঠাকুরদা, বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বার্ট।

ছবিতে, সামনের সারির ওই গণ্যমান্যদের মাঝে, তাদের পায়ের কাছে সাদা জামা-প্যান্ট, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা মোজা আর চকচকে জুতো পায়ে একটি বাচ্চা ছেলেও বসেছিল।

তিনিই সুজানার বাবা।

(সামনের সারিতে সাদা পোষাকের শিশুটিই সুজানা হার্বার্টের বাবা)

ভারতে বড় হয়ে ওঠার কিছু কাহিনী মেয়েকে শুনিয়েছিলেন তিনি। তার মধ্যে একটা ঘটনা ছিল কীভাবে ‘ফাদার ক্রিসমাস’ হাতির পিঠে চেপে এসেছিলেন, সেই গল্পটাও ছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই, আর খুব একটা বেশি কিছু বলেন নি তিনি মেয়েকে।

আর ঠাকুরদার ব্যাপারে খুবই কম কথা বলা হত। তিনি ১৯৪৩ সালেই মারা যান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ

দুর্ভিক্ষের অনেক জটিল কারণ ছিল। গোটা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে জন হার্বার্টই ছিলেন সেই সময়ে বাংলার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাকে জবাবদিহি করতে হত দিল্লিতে, আর সেখানকার কর্মকর্তাদের মাথায় ছিলেন লন্ডনের কর্তাব্যক্তিরা।

ইতিহাসবিদ ও ‘হাংরি বেঙ্গল’ গ্রন্থটির লেখক ড. জনম মুখার্জী আমাকে বলছিলেন মি. হার্বার্ট “ছিলেন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, যিনি সেই সময়ে বাংলার প্রধান কার্যনির্বাহী হিসাবে সরাসরি দুর্ভিক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।“

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি একটা নীতি অনুসরণ করতেন – ‘অস্বীকার’ করা, যে নৌকো আর প্রধান খাদ্য চাল বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে অথবা হাজার হাজার গ্রামে সেগুলো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। ভয়টা ছিল যে জাপানিরা যদি আক্রমণ করে, তাহলে শত্রুপক্ষ যাতে স্থানীয় ভাবে রসদ যোগাড় করে ভারতের অভ্যন্তরে অগ্রসর না হতে পারে।

তবে আগে থেকেই নড়বড়ে হয়ে থাকা অর্থনীতির ওপরে এই ঔপনিবেশিক নীতি একটা বিপর্যয় নামিয়ে এনেছিল। জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারতেন না, কৃষকরা নদী বেয়ে তাদের জমিতে যেতে পারতেন না, কারিগরদের অনুমতি ছিল না তাদের তৈরি জিনিষপত্র হাটে-বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসার।

এক কথায়, চাল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যাবে না।

মুদ্রাস্ফীতি আগে থেকেই চড়ে ছিল, কারণ দিল্লির ঔপনিবেশিক সরকার এশিয় যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল খরচ সামাল দেওয়ার জন্য নোট ছেপেই চলেছিল। অন্যদিকে মিত্র শক্তির লক্ষ লক্ষ সৈনিকে কলকাতায় অবস্থান করার কারণে খাবারের যোগানে টান ধরছিল।

জাপানের হাতে বার্মার পতনের পরে সেখান থেকে চাল আমদানিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক সময়েই বাড়তি লাভের আশায় চাল মজুত করে রাখা হত।

এর ওপরে আঘাত হেনেছিল এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, যাতে বাংলার চাষ করা ধানের বেশির ভাগটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভা এবং প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কাছে যুদ্ধের মধ্যেই বারবার খাদ্য সামগ্রী আমদানির জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কখনও আংশিক অনুমতি পাওয়া যেত, অনেক ক্ষেত্রেই অনুরোধ নাকচ করে দেওয়া হত।

(সিল্কের স্কার্ফগুলোতে সুতোর কাজ করে লেখা থাকত ‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’)

‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’

যত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সেই সংখ্যাটা বিপুল। তৎকালীন বাংলার গভর্নরের নাতনি সুজানা ঘটনার অনেক দশক পরেও কেন লজ্জিত বোধ করছিলেন, সেটা এতক্ষণে আমি অনুভব করতে পারছি।

মিজ হার্বার্ট ব্যাখ্যা করার করছিলেন, “যখন ছোট ছিলাম, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকাটা বেশ গৌরবের ব্যাপার বলে মনে করতাম।“

তিনি বলছিলেন যে তার ঠাকুরদার পুরণো পোষাকগুলো চেয়ে নিয়ে আসতেন তিনি।

“সিল্কের স্কার্ফগুলোতে সুতোর কাজ করে লেখা থাকত ‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’,” বলছিলেন তিনি।

“আর এখন যখন আলমারির পেছন দিকে রাখা ওগুলোর দিকে তাকাই, আমি যেন কেঁপে উঠে বলি, এগুলো কেন আমি পরতে চাইতাম! ওই যে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ শব্দগুলো লেখা, সেসব পরা একেবারেই অনুচিত মনে হয় এখন,” বলছিলেন মিজ হার্বার্ট।

বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে যা কিছু পাচ্ছেন, সেসব পড়ে ফেলছেন সুজানা। ওয়েলসে তাদের পারিবারিক বাসভবনের ‘হার্বার্ট সংগ্রহশালায়’ তার পিতামহের যত নথিপত্র রাখা আছে, সেসবও পড়ছেন তিনি।

সব নথি একটা আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা থাকা। মাসে একবার করে একজন সংগ্রহশালা বিশেষজ্ঞ সেখানে আসেন।

যত পড়ছেন, ততই নিজের পিতামহকে বুঝতে পারছেন তিনি।

“এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তিনি যে সব নীতি চালু করেছিলেন বা প্রয়োগ করেছিলেন, সেসব গুলোই দুর্ভিক্ষের ব্যাপকতার ওপরে গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল,” বলছিলেন মিজ হার্বার্ট।

তার কথায়, “তার দক্ষতা ছিল, তার সম্মান ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক দূরবর্তী প্রান্তে ছয় কোটি মানুষের জীবন জীবিকা নিয়ন্ত্রণ করেন, এরকম একটা পদে তাকে নিয়োগ করাটাই অনুচিত ছিল। “

সুজানা হার্বার্ট (ডাইনে) আর জনম মুখার্জী (বাঁয়ে)

সুজানা হার্বার্ট আর জনম মুখার্জী মুখোমুখি

পারিবারিক সংগ্রহশালায় মিজ হার্বার্ট ১৯৩৯ সালে লেখা একটা চিঠি খুঁজে পেয়েছেন। ওই চিঠিটি স্বামীকে লিখেছিলেন লেডি মেরি, মিজ হার্বার্টের ঠাকুমা। বাংলার গভর্নরের জন্য মনোনীত হওয়ার খবর পেয়েই ওই চিঠি লিখেছিলেন লেডি মেরি। সেখানে ভাল-মন্দ সবরকমই লেখা ছিল। তবে একটা বিষয় তিনি স্বামীকে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাদের যাওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই, যদিও স্বামী যা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই তিনি মেনে নেবেন, এমনটাও লিখেছিলেন লেডি মেরি।

আমি বেশ কয়েক মাস ধরে সুজানা হার্বার্টের সঙ্গে কাজ করছি, তার ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখার আগ্রহ দেখছি। নিজের ঠাকুরদার সম্বন্ধে বিশদে জানতে চাইছেন তিনি, অনেক প্রশ্ন জমে আছে তার মনে।

আর সেই সব প্রশ্ন তিনি সরাসরি করতে চেয়েছিলেন ইতিহাসবিদ জনম মুখার্জীর সামনে।

তাদের দেখা হয় জুন মাসে।

জনম মুখার্জী কখনও কল্পনাও করেন নি যে কখনও তিনি জন হার্বার্টের নাতনির মুখোমুখি বসবেন।

সুজানা হার্বার্ট জানতে চেয়েছিলেন যে একজন পার্লামেন্ট সদস্য, সরকারি দলের মুখ্য সচেতক, এরকম একজন ব্যক্তি – তার ঠাকুরদাকে আদতে কেন এমন একটা পদে নিয়োগ করা হয়েছিল, যখন তার ভারতের রাজনীতি সম্বন্ধে সেরকম কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। সামান্য কিছুদিন দিল্লিতে একজন তরুণ অফিসার হিসাবে তিনি কাজ করেছিলেন শুধু।

মি. মুখার্জীর ব্যাখ্যা, “আধিপত্যের ভাবনা থেকেই যে ঔপনিবেশিকতার জন্ম, তারই অঙ্গ এটা।“

“যাদের উপনিবেশ সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই, ভাষা সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান নেই, যুক্তরাজ্যের বাইরে কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় যারা কাজ করে নি, এরকম কিছু পার্লামেন্ট সদস্য খুব সহজেই কলকাতার গভর্নর হাউসে অধিষ্ঠিত হয়ে যেতেন আর এমন এক বিশাল সংখ্যক মানুষের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেন, যাদের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না,” মন্তব্য জনম মুখার্জীর।

(জন হার্বার্ট (বাঁয়ে), সঙ্গে স্ত্রী লেডি মেরি, ১৯৪০ সালের ছবি)

‘দুর্বলতম গভর্নর’

বাংলার রাজনীতিবিদদের কাছে জন হার্বার্ট খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। এমনকি দিল্লিতে তার ঊর্ধ্বতন কর্তারাও তার দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ করতেন। এই ঊর্ধ্বতনদের মধ্যে ছিলেন বড়লাট লিনলিথগো-ও।

জনম মুখার্জীর কথায়, “লিনলিথগো তো সরাসরি তাকে ভারতের দুর্বলতম গভর্নর বলে মনে করতেন। সত্যি কথা বলতে তারা সবাই তাকে সরিয়ে দেওয়ারই পক্ষপাতী ছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটাকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে নানা মহলে, তা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন সবাই।“

সুজানার উত্তর ছিল, “এই কথাগুলো শোনা বেশ কঠিন।“

ওদের দুজনেরই একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক জড়িয়ে ছিল গোটা বিষয়ে।

মি. মুখার্জী আর মিজ হার্বার্ট – দুজনের বাবাই মোটামুটি একই সময়ে শিশু অবস্থায়

কলকাতায় কাটিয়েছেন। তবে দুজনের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে।

তারা দুজনেই এখন মারা গেছেন। মিজ হার্বার্টের কাছে তবুও কিছু ছবি রয়েছে।

তবে জনম মুখার্জীর কাছে তার বাবার ছোটবেলার কোনও ছবি নেই।

“তাই আমি যেটুকু জেনেছি, সবই তার রাতের বেলার দুঃস্বপ্নগুলো থেকে, আর একটা ঔপনিবেশিক যুদ্ধ ক্ষেত্রে কাটানো ছোটবেলার কিছু ঘটনা যা তিনি আমাকে বলেছিলেন, সেসব থেকে।“

এরপরে মি. মুখার্জী এমন একটা কথা বললেন, যেটা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

“আমার ঠাকুরদাও ঔপনিবেশিক পুলিশ বাহিনীতে কাজ করতেন। তাই আমার ঠাকুরদা সেই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় বেশ নিশ্চিন্তেই ছিলেন,” বললেন, জনম মুখার্জী।

বাংলার দুর্ভিক্ষে অন্তত ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেলেন, অথচ তার কোনও স্মৃতিস্তম্ভ বা এমনকি একটা স্মৃতি ফলকও বিশ্বের কোথাও নেই।

সুজানা হার্বার্ট অন্তত তার ঠাকুরদার একটা স্মৃতি স্তম্ভ দেখাতে পারেন।

“যে চার্চে আমরা প্রার্থনা করি, সেখানে তাকে সম্মান জানিয়ে একটা ফলক আছে,” বলছিলেন তিনি। তবে এটা বোধহয় তার সমাধি না থাকার কারণেই। তার সমাধি কোথায় সেটা ঠিক জানেন না মিজ হার্বার্ট – কলকাতাতে কী?

(দুর্ভিক্ষপীড়িতদের খাবার বিলির সময়ে তৎকালীন বড়লাট স্যার অর্চিবল্ড ওয়াভেল)

 

‘এটা ব্রিটেনের লজ্জা’

নিজের ঠাকুরদার বর্ণনা দেওয়ার জন্য সুজানা হার্বার্ট একটা শব্দ ব্যবহার করতেন, ‘গৌরব’, তবে তিনি তার ঠাকুরদার ব্যর্থতাগুলোও তুলে ধরতেন।

“আমাদের যেভাবে বিষয়গুলি বলা হয়েছিল, আমি এটা মেনে নিই, যে সত্যিকারের ইতিহাস হয়তো তার থেকে আরও অনেক জটিল। তবে এটা মেনে নেওয়া আমার কাছে বেশ কঠিন যে জন হার্বার্ট যে কাজ করেছিলেন, সেটা মোটেই গৌরবের কিছু করেন নি,” বলছিলেন সুজানা হার্বার্ট।

ঘটনার পরে ৮০ বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও এখনও অনেক কিছুরই জট কাটে নি, অনেক কিছুই এখনও অজানা।

অনেক মাস ধরে সুজানা হার্বার্ট যে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন, তার পরেও কী তার কাছে ‘লজ্জা’ শব্দটার মাধ্যমেই তার আবেগটা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে?

তিনি বলছিলেন যে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছে।

“আমার মনে হয় ‘লজ্জা’ শব্দটা খুব বেশি আমার ব্যক্তিগত আবেগকে কেন্দ্র করে থাকে। কিন্তু এখানে তো শুধু আমি কী ভাবছি সেটা বড় ব্যাপার না!” বলছিলেন সুজানা হার্বার্ট।

জনম মুখার্জী বললেন, “একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার উত্তরসূরি হিসাবে ‘লজ্জা’ ব্যাপারটা তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পরিবাহিত হতে পারে না। এটা ব্রিটেনের লজ্জা।“

“বাংলার মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেছেন। তাই ব্যক্তিগত স্তরে এবং সমষ্টিগত ভাবে ইতিহাসের সঠিক প্রতিফলন হওয়া দরকার।“

সেই ইতিহাসই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন সুজানা হার্বার্ট। নিজের বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান তার গবেষণা-লব্ধ তথ্য, যদিও তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে পরিবারের বাকি সবাই কীভাবে সেগুলো নেবে।

তবে তিনি আশা করছেন যে তার সন্তানরা তার কাজে সাহায্য করবে, পারিবারিক সংগ্রহশালায় জমা থাকা নথির পাহাড় ঘেঁটে তাকে কিছুটা সহায়তা করবে।

বিবিসি নিউজ বাংলা