০২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
জঙ্গিদের হাতে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা, সাভার-আশুলিয়ায় পরপর উদ্ধারে পুলিশের উদ্বেগ নেপালে তিব্বতবিষয়ক সম্মেলন বাতিল, চীনের চাপ নিয়ে তীব্র বিতর্ক  ভারত নান্দেডের গুরুদ্বারে সুখবীর বাদলের ওপর হামলা, হাতে সামান্য আঘাত বিরোধীদের ঐক্যে চাপে মোদি সরকার, পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ বিল ঠেকানোর দাবি কংগ্রেসের ভারত খড়গের সভাস্থল ‘শুদ্ধিকরণ’ নিয়ে উত্তাল উত্তরাখণ্ড, বিজেপির বিরুদ্ধে জাতপাতের অভিযোগ মোদির বিদেশনীতি নিয়ে রাহুলের কটাক্ষ, ‘মোদিভক্ত’ হয়ে দেশের লাভ হবে না: খার্গে উত্তরাখণ্ডের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ধস ও পানির স্রোত, আটকা পড়ার আশঙ্কা ৬ শ্রমিকের তরুণ শক্তির আবেগে সাজছে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস ৫৪৩ আসনেই লোকসভা স্থির রাখার দাবি, মোদিকে চিঠি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর রাজস্থানে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পথে বড় পদক্ষেপ, ২৯ প্রজাতির গাছ পাবে বিশেষ সুরক্ষা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১২১)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৫
  • 92

ফরিদপুর জেলা স্কুলে

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়িতে বিধুভূষণ ভট্টাচার্য নামে আমাদের ক্লাসে একজন নতুন শিক্ষক আসিলেন। তিনি এত সুন্দর করিয়া পড়াইতেন। গ্রামার ও ব্যাকরণের নিয়মগুলি তিনি বোর্ডে ছবি আঁকিয়া পানির মতো বুঝাইয়া দিতেন। ইংরেজিতে আমি খুব কাঁচা ছিলাম। মাসে দুই টাকা মাত্র বেতন লইয়া তিনি আমাকে প্রাইভেট পড়াইতে রাজি হইয়াছিলেন। স্কুলের ছুটি হইলে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁহার বাসায় যাইয়া পড়াশুনা করিতাম।

তখনকার দিনে অনেক হিজিবিজি কবিতা লিখিয়া তাঁহাকে দেখাইতাম। তিনি পড়িয়া খুব তারিফ করিতেন। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়া আমি প্রমোশন পাইয়া ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠিলাম। আমার চাচাতো ভাই নেহাজউদ্দীন পাশ করিতে পারিল না। এই ফেল করিবার ফলে সে স্কুলে আসা বন্ধ করিল। তাহাকে স্কুলে আসিবার জন্য তাহার পিতাও তেমন আগ্রহ দেখাইলেন না। আমার চাচাতো ভাইটি যদিও পড়াশুনা আর করিল না, উপস্থিত বুদ্ধির ব্যাপারে সে চিরকালই আমাকে পরাজিত করিত। মুখে-মুখে হিসাব করিতে তাহার মতো আমাদের গাঁয়ে একজনও ছিল না।

ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠিলেই আমাদের বাংলা পড়াইতে আসিলেন বাবু যোগেন্দ্রনাথ সেন মহাশয়। কথাবার্তায় সামান্য চট্টগ্রামের টান তাঁহার ছিল। কিন্তু বাংলা পড়াইতে যাইয়া বাংলা সাহিত্যের প্রতি তিনি তাঁর ছাত্রদের মনে একটি গভীর অনুরাগ জাগাইয়া তুলিতে পারিতেন। ব্যাকরণের কঠিন তত্ত্বগুলি তিনি পানির মতো করিয়া বুঝাইয়া দিতেন। তাঁহার ক্লাসে পড়িয়া আমি বাংলা সাহিত্যের প্রতি বিশেষ অনুরাগী হইয়া পড়িতাম। পণ্ডিত মহাশয়ের এক ভাই আমার সহপাঠী ছিল। ছুটির দিনে পণ্ডিত মহাশয়ের বাসায় যাইয়া আমি পড়াশুনা করিতাম। অবসর সময় তাঁহার বাড়ির আমগাছে উঠিয়া পাকা আম পাড়িতাম, জামরুল গাছে উঠিয়া এ-ডাল ও-ডাল ভাঙিতাম। পণ্ডিত মহাশয় কিছুই বলিতেন না।

আমার সুদীর্ঘ জীবনে যত ভালো ভালো শিক্ষক দেখিয়াছি এই পণ্ডিত মহাশয় তাঁহাদের অন্যতম। অনেক বিদ্যা তিনি জানিতেন না। কিন্তু যেটুকু তিনি জানিতেন তাহা তিনি ছাত্রদের মনে ভরিয়া দিতে পারিতেন।

এই পণ্ডিত মহাশয়ের অতিথি হইয়া আসিলেন ক্ষীরোদবাবু। ইনি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ভাব-শিষ্য ছিলেন।

খবর পাইয়া একদিন এই কবির সঙ্গে দেখা করিতে গেলাম। আমার জীবনে একজন কবিদর্শন এই প্রথম। মনে মনে তাঁহার প্রতি যেসব কল্পনা আরোপ করিয়াছিলাম তাহাতে আমি ভাবিয়াছিলাম একজন সত্যকার কবি যেন কেমন হইবেন। তাঁর লম্বা চুল থাকিবে।

ক্ষণেক কাঁদিবেন, ক্ষণেক হাসিবেন। কিন্তু তাঁহাকে দেখিয়া বড়ই আশ্চর্য হইলাম। আমাদের শিক্ষক মহাশয়দের মতোই তিনি একজন সাধারণ মানুষ। কবি বলিয়া কে চিনিবে? আমাকে তিনি অতি আদরের সঙ্গে গ্রহণ করিলেন। আমার কবিতার খাতাখানি পড়িয়া স্থানে স্থানে সংশোধন করিয়া দিলেন। ইহার পর প্রায়ই পণ্ডিত মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করিতে যাইতাম।

 

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

জঙ্গিদের হাতে রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা, সাভার-আশুলিয়ায় পরপর উদ্ধারে পুলিশের উদ্বেগ

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১২১)

১১:০০:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৫

ফরিদপুর জেলা স্কুলে

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়িতে বিধুভূষণ ভট্টাচার্য নামে আমাদের ক্লাসে একজন নতুন শিক্ষক আসিলেন। তিনি এত সুন্দর করিয়া পড়াইতেন। গ্রামার ও ব্যাকরণের নিয়মগুলি তিনি বোর্ডে ছবি আঁকিয়া পানির মতো বুঝাইয়া দিতেন। ইংরেজিতে আমি খুব কাঁচা ছিলাম। মাসে দুই টাকা মাত্র বেতন লইয়া তিনি আমাকে প্রাইভেট পড়াইতে রাজি হইয়াছিলেন। স্কুলের ছুটি হইলে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁহার বাসায় যাইয়া পড়াশুনা করিতাম।

তখনকার দিনে অনেক হিজিবিজি কবিতা লিখিয়া তাঁহাকে দেখাইতাম। তিনি পড়িয়া খুব তারিফ করিতেন। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়া আমি প্রমোশন পাইয়া ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠিলাম। আমার চাচাতো ভাই নেহাজউদ্দীন পাশ করিতে পারিল না। এই ফেল করিবার ফলে সে স্কুলে আসা বন্ধ করিল। তাহাকে স্কুলে আসিবার জন্য তাহার পিতাও তেমন আগ্রহ দেখাইলেন না। আমার চাচাতো ভাইটি যদিও পড়াশুনা আর করিল না, উপস্থিত বুদ্ধির ব্যাপারে সে চিরকালই আমাকে পরাজিত করিত। মুখে-মুখে হিসাব করিতে তাহার মতো আমাদের গাঁয়ে একজনও ছিল না।

ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠিলেই আমাদের বাংলা পড়াইতে আসিলেন বাবু যোগেন্দ্রনাথ সেন মহাশয়। কথাবার্তায় সামান্য চট্টগ্রামের টান তাঁহার ছিল। কিন্তু বাংলা পড়াইতে যাইয়া বাংলা সাহিত্যের প্রতি তিনি তাঁর ছাত্রদের মনে একটি গভীর অনুরাগ জাগাইয়া তুলিতে পারিতেন। ব্যাকরণের কঠিন তত্ত্বগুলি তিনি পানির মতো করিয়া বুঝাইয়া দিতেন। তাঁহার ক্লাসে পড়িয়া আমি বাংলা সাহিত্যের প্রতি বিশেষ অনুরাগী হইয়া পড়িতাম। পণ্ডিত মহাশয়ের এক ভাই আমার সহপাঠী ছিল। ছুটির দিনে পণ্ডিত মহাশয়ের বাসায় যাইয়া আমি পড়াশুনা করিতাম। অবসর সময় তাঁহার বাড়ির আমগাছে উঠিয়া পাকা আম পাড়িতাম, জামরুল গাছে উঠিয়া এ-ডাল ও-ডাল ভাঙিতাম। পণ্ডিত মহাশয় কিছুই বলিতেন না।

আমার সুদীর্ঘ জীবনে যত ভালো ভালো শিক্ষক দেখিয়াছি এই পণ্ডিত মহাশয় তাঁহাদের অন্যতম। অনেক বিদ্যা তিনি জানিতেন না। কিন্তু যেটুকু তিনি জানিতেন তাহা তিনি ছাত্রদের মনে ভরিয়া দিতে পারিতেন।

এই পণ্ডিত মহাশয়ের অতিথি হইয়া আসিলেন ক্ষীরোদবাবু। ইনি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ভাব-শিষ্য ছিলেন।

খবর পাইয়া একদিন এই কবির সঙ্গে দেখা করিতে গেলাম। আমার জীবনে একজন কবিদর্শন এই প্রথম। মনে মনে তাঁহার প্রতি যেসব কল্পনা আরোপ করিয়াছিলাম তাহাতে আমি ভাবিয়াছিলাম একজন সত্যকার কবি যেন কেমন হইবেন। তাঁর লম্বা চুল থাকিবে।

ক্ষণেক কাঁদিবেন, ক্ষণেক হাসিবেন। কিন্তু তাঁহাকে দেখিয়া বড়ই আশ্চর্য হইলাম। আমাদের শিক্ষক মহাশয়দের মতোই তিনি একজন সাধারণ মানুষ। কবি বলিয়া কে চিনিবে? আমাকে তিনি অতি আদরের সঙ্গে গ্রহণ করিলেন। আমার কবিতার খাতাখানি পড়িয়া স্থানে স্থানে সংশোধন করিয়া দিলেন। ইহার পর প্রায়ই পণ্ডিত মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করিতে যাইতাম।

 

চলবে…