চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতির পেছনে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ব্যবসায়িক লোকসান, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং করপোরেট মুনাফা সংকুচিত হওয়াসহ ১১টি প্রধান কারণকে দায়ী করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত আসনের সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকার ৭৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ের চিত্র
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৪ লাখ টাকা।
তিনি জানান, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে রাজস্ব আহরণে চাপ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাময়িক প্রশাসনিক শূন্যতা, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি প্রায় দুই অঙ্কের ঘরে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও বেতনভোগী মানুষের ব্যবহারযোগ্য আয় কমেছে, যা করযোগ্য আয়ের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়া এবং পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে অনেক ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে করপোরেট কর আদায়ের ওপর।
শিল্প ও বাণিজ্যে চাপ
অর্থমন্ত্রী জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তৈরি পোশাকসহ অনেক রপ্তানিমুখী ও উৎপাদনশীল শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারেনি। পাশাপাশি কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ হ্রাস, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ধীরগতি, উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রদানকারী বহু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজস্ব সংগ্রহকে দুর্বল করেছে।

আমদানি কমায় শুল্ক আয়েও প্রভাব
অর্থমন্ত্রী জানান, ২৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ শুল্কহারভুক্ত পণ্যের আমদানি আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ৩৭ শতাংশ কমেছে। ফলে শুল্ক আয় কমে গেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার কর্তৃক শুল্ক ও কর কমানো এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারও রাজস্ব আয় হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন এইচএস কোড অন্তর্ভুক্তি এবং বিলাসবহুল যানবাহনের আমদানি কমে যাওয়াও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রভাব
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত হয়েছে। এতে সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ঋণ ও জলবায়ু অর্থায়নের তথ্য
সংসদে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের স্থিত ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৭০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে মে মাস পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও সুকুকের মাধ্যমে সরকারের স্থিত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৭৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া তিনটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট ৪৮৪ দশমিক ৪১১ মিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন পেয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















