জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত পূর্বাভাস মডেল থেকে সরে এসেছে বিজ্ঞানীরা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্র নির্ধারণে ব্যবহৃত সবচেয়ে চরম নির্গমনভিত্তিক দৃশ্যপটটি এখন আর বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন গবেষকরা। নতুন এই সিদ্ধান্ত জলবায়ু বিজ্ঞানী মহলে যেমন আলোচনা তৈরি করেছে, তেমনি নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কেন বাদ দেওয়া হলো পুরোনো দৃশ্যপট
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ তাপমাত্রা নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন সম্ভাব্য নির্গমন পরিস্থিতি ব্যবহার করেন। এসব পরিস্থিতি নির্ভর করে মানুষ কতটা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করবে, বন উজাড় কতটা হবে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কী হারে বাড়বে তার ওপর।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সবচেয়ে আলোচিত ছিল উচ্চ নির্গমনভিত্তিক একটি দৃশ্যপট, যেখানে ধারণা করা হয়েছিল শতাব্দীর শেষ নাগাদ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সেই হিসেবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি খাতের পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত বিস্তার এবং অনেক দেশের জলবায়ু নীতির কারণে গবেষকরা এখন মনে করছেন এমন পরিস্থিতি ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে নতুন জলবায়ু মডেল থেকে এই চরম দৃশ্যপট বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্র কোথায়
সমালোচকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল, এই দৃশ্যপট বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত ছিল। বিশেষ করে এতে বৈশ্বিক কয়লা ব্যবহারের যে বিশাল বৃদ্ধি ধরা হয়েছিল, তা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম বলে তারা মনে করতেন।
তাদের অভিযোগ, বহু গবেষণা, সংবাদ প্রতিবেদন এবং নীতিগত আলোচনায় এই দৃশ্যপটকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সেটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। ফলে জলবায়ু ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত ভয় তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা জানা জরুরি। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বরফস্তর গলে যাওয়া কিংবা ভয়াবহ খরার মতো ঝুঁকি মূল্যায়নে এমন চরম সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

নতুন পূর্বাভাস কী বলছে
নতুন প্রজন্মের জলবায়ু মডেলে একটি মধ্যম মাত্রার নির্গমন পরিস্থিতিকে বর্তমান সরকারি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধরে নেওয়া হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
যদিও এটি আগের চরম পূর্বাভাসের তুলনায় কম, তবুও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এই মাত্রার উষ্ণতাও মানবসভ্যতা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সরবরাহ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পৃথিবী ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়ে গেছে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ঝুঁকি কমেনি, বদলেছে মূল্যায়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে চরম দৃশ্যপট বাদ দেওয়া হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি কমে যায়নি। বরং নতুন গবেষণা বলছে, তুলনামূলক মধ্যম মাত্রার উষ্ণায়নেও অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ খরা, তাপপ্রবাহ এবং পরিবেশগত ক্ষতি দেখা দিতে পারে, যা আগে কেবল উচ্চ নির্গমন পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হতো।
তাই গবেষকদের ভাষায়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস ব্যবহার করা যেমন জরুরি, তেমনি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা এখনও বিশ্ববাসীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
জলবায়ু পূর্বাভাসে বড় পরিবর্তন, সবচেয়ে চরম উষ্ণায়ন দৃশ্যপট বাদ দিলেন বিজ্ঞানীরা
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















